ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এমডি মাসরুর আরেফিনের ব্যক্তিগত আশ্রয়ে প্রাক্তন শিবির ক্যাডার সিজনের সিটি ব্যাংকে রহস্যময় প্রত্যাবর্তন

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

এমডি মাসরুর আরেফিনের ব্যক্তিগত আশ্রয়ে প্রাক্তন শিবির ক্যাডার সিজনের সিটি ব্যাংকে রহস্যময় প্রত্যাবর্তন

​একসময়ের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় ক্যাডার ও রাজনৈতিক বহুরূপী মোতাসিম বিল্লাহ সিজনকে ঘিরে ব্যাংকিং খাতে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন চাঞ্চল্য। আমানতকারীদের বিপুল অর্থ ও ব্যাংকিং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ‘সিটি ব্যাংক'কে ক্ষমতার আখড়ায় পরিণত করেছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মাসরুর আরেফিন। সিজনের আর্থিক দুর্নীতি, নারী সহকর্মী নিগ্রহ ও অপরাধের অডিও প্রমাণ মিললেও তাকে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং এমডি মাসরুর আরেফিনের ব্যক্তিগত ছায়াতলে ও স্বার্থের টানে সুকৌশলে ৯ মাস পর তাকে সিটি ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই অপশক্তির কাছে বর্তমানে জিম্মি হয়ে পড়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

​সম্প্রতি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডে মোতাসিম বিল্লাহ সিজনকে স্বকণ্ঠে স্বীকার করতে শোনা যায় তার রাজনৈতিক রূপান্তরের গল্প। তিনি স্বীকার করেন, "আমি নড়াইলে ছাত্র জীবনে শিবির করেছি। পোস্টেড আমি শিবির করছি... আমার বাবা জামায়াত করে, আমার বাবা হচ্ছে একটা মসজিদের ইমাম।" নড়াইলে ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনে এক সামান্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়া সিজন অতি অল্প সময়েই বিপুল ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছান। সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং তৎকালীন বিতর্কিত শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের বিপুল পরিমাণের অবৈধ ও কালো টাকা পাচার, গোপন ফান্ড সংরক্ষণ ও ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করার মূল সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন সিজন।

​কোনো বিশেষ দক্ষতা বা পারদর্শিতা ছাড়াই কেবল এমডি মাসরুর আরেফিনের অন্ধ কৃপায় ২০২১ এবং ২০২২ সালের মধ্যে একই বছরে নিয়ম লঙ্ঘন করে দুটি প্রমোশন দেওয়া হয় সিজনকে। রাতারাতি তাকে বানানো হয় সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ও বনানী শাখার ব্যবস্থাপক। ব্যাংকের ভেতরে চলা বড় বড় আর্থিক জালিয়াতি ধামাচাপা দেওয়া এবং পুলিশ প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করতে তৎকালীন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বজনদের ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার আদান-প্রদানও চালায় এই সিন্ডিকেট।

​ব্যাংকে সিজনের বেপরোয়া ও অমানবিক আচরণ চূড়ান্ত রূপ নেয় বনানী শাখায়। যখন তিনি এক নারী সহকর্মীর ওপর চরম অসৌজন্যমূলক ও অশালীন নির্যাতন চালান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সহকর্মীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে শোকজ নোটিশ জারি করলেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি পদত্যাগের নাটক করেন। পরে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হলেও কোনো তদন্ত বা আইনি নিষ্পত্তির তোয়াক্কা না করে ৯ মাসের মাথায় এমডি মাসরুর আরেফিন একক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অত্যন্ত গোপনে সিজনকে সিটি ব্যাংকে পুনর্বাসিত করেছেন তিনি। ব্যাংকের ভেতরের বড় বড় আর্থিক লুটপাট এবং বাইরের স্বৈরাচারী চক্রকে ম্যানেজ করতে সিজন অপরিহার্য বলেই তাকে এভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

​সিটি ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো গড়ে উঠেছে সিজনের সম্পদ। ঢাকার আফতাব নগরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যৌথ মালিকানায় কোটি কোটি টাকার প্লট এবং প্রশাসনিক ভয়ভীতি দেখিয়ে আফতাব নগর সোসাইটি নির্বাচনে ভোট কারচুপির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার নামে। এমনকি ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহকের জব্দ করা ৫২ লাখ টাকা মূল্যের টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িও তিনি বেআইনিভাবে নিজের নামে হাতিয়ে নেন। যা সরাসরি ব্যাংকিং নিয়মের চরম লঙ্ঘন। এছাড়া কোটি কোটি টাকা খরচ করে অভিজাত বনানী ক্লাব ও ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্যপদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

​স্বকণ্ঠে রাজনৈতিক পরিচয় স্বীকার করা এবং দুর্নীতির প্রমাণ সত্ত্বেও একজন সাবেক শিবির ক্যাডারকে এমডির নিজ স্বার্থে পুনর্বাসন করার ঘটনা ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে। আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং সিটি ব্যাংককে লুটপাটের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এমডি মাসরুর আরেফিন ও মোতাসিম বিল্লাহ সিজনের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ ব্যাংক কর্মকর্তা ও সাধারণ গ্রাহকেরা।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!