দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে স্থাপিত সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে বড় ঘাটতি। এর পেছনে জ্বালানি সংকট, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে।
কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন নেমে এসেছে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে। ফলে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টির বেশি কেন্দ্র বন্ধ অথবা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন হলেও সরবরাহ তার তুলনায় অনেক কম। অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিবর্তে দীর্ঘদিন আমদানি করা এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে সেই আমদানি নির্ভরতা বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পায়রা ও রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও জ্বালানি সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পরিমাণ বিল সরকারের কাছে বকেয়া থাকার কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয় ‘কুইক রেন্টাল’ এবং ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও নির্দিষ্ট সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কেন্দ্র মালিকদের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে কুইক রেন্টাল পদ্ধতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। একই সময়ে বিদ্যুৎ খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
সমালোচকদের দাবি, এসব ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর দীর্ঘ দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ, জ্বালানি, মিটারিং ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে সুবিধা পেয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
মাতারবাড়ীতে এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্পসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে প্রভাব খাটানো এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিপিডিসি, নেসকো ও আরইবির বিভিন্ন প্রিপেইড মিটারিং এবং আইটি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রভাবশালী কয়েকটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এসব প্রকল্পে সুবিধা পেয়েছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদন পাওয়া একাধিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েকটিতে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। প্রকল্প অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার এবং বিভিন্ন দেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মাল্টা, মালয়েশিয়া ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে নসরুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল দাবি করছে।
তবে এসব সম্পদ ও অর্থের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং পাচারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে কোনো মন্তব্য করা যায় না।
বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সাবেক বিদ্যুৎ সচিব এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দায়িত্বকালে বিদ্যুৎ বিভাগের বড় কিছু প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ত্বরান্বিত হয়।
সব মিলিয়ে বিগত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে নেওয়া নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি আমদানি এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তিগুলো নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান লোডশেডিং শুধু তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকটের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা, আর্থিক চাপ এবং বিদ্যুৎ খাতে অনিয়মের অভিযোগের সম্মিলিত প্রভাবও এর পেছনে রয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :