যদি গণতন্ত্র মানি তবে বলতেই হবে রাষ্ট্র ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণ ভোটের মাধ্যমে যাকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিবে তারাই একটি দেশের বৈধ সরকার। তারা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করবেন এটাই গণতান্ত্রিক রীতি এবং নীতি।
জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যে পতন ঘটাবেন বলে কেউ বা কোন রাজনৈতিক দল সময় বেঁধে দিবেন এটা গণতান্ত্রিক রীতি নীতির বিপরীত। অতি সম্প্রতি ১১ দলীয় জোট ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখী পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছে। এটি কেবলমাত্র একটি সাধারণ বিরোধী কর্মসূচি ছিল না। এটি ছিল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক স্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজপথের দীর্ঘ বহর, বিশাল জনসমাগম এবং মঞ্চের বক্তব্যগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফেনীর মহিপালে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যখন ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ শোনার কথা বলছেন, তখন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ আরও এক ধাপ এগিয়ে পতন ঘটাতে ‘ডিসেম্বর’ মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে জোটের নেতাকর্মীদের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত নির্বাচনের মাধ্যমে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে বা সাংবিধানিক মেয়াদ শেষে সরকারের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু রাজপথের সমাবেশ থেকে ‘সরকার পতনের মাস’ ঘোষণা করা প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—রাজনীতিতে এই ‘ডিসেম্বর’-এর আসল অর্থ কী?
১১ দলীয় জোটের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির অনেকগুলোই জনজীবনের বাস্তব সংকটের সঙ্গে যুক্ত—যেমন জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট নিরসন এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। এসব জনদাবি কোনো দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষেই এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
তবে মূল প্রশ্নটি এখানে দাবি নিয়ে নয়, দাবি আদায়ের পথ নিয়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আন্দোলন বা প্রতিবাদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু রাজপথের এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ কি নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া জাতীয় ম্যান্ডেটের বিকল্প হতে পারে? এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম যখন ৬ দফাকে ‘এক দফায়’ রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দেন, কিংবা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—রাজপথের শক্তি প্রদর্শন করে কি একটি নির্বাচিত সরকারের বিদায়ের সময় নির্ধারণ করা সম্ভব?
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কর্মসূচিতে জোটটির সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় নিশ্চিতভাবেই স্পষ্ট হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় জনসমাবেশ দিয়ে জনমতের একাংশের আবেগ ফুটিয়ে তোলা নতুন কিছু নয়। তবে মহাসড়কের কয়েক কিলোমিটারের উপস্থিতি আর সারা দেশের ভোটের বাক্স এক বিষয় নয়। রাজপথের সাফল্যকে পুরো দেশের একমাত্র কণ্ঠস্বর মনে করার মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকে।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারকে পরাজিত করা আর অনবরত আন্দোলনের চাপে টেনে নামানোর মধ্যে একটি মৌলিক ফারাক রয়েছে। এই সীমারেখা স্পষ্ট না থাকলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রশাসনিক দলীয়করণ কিংবা বিদ্যুৎ সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক যেকোনো ব্যর্থতা বা নীতিগত মতপার্থক্যকে ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিবাদ’ আখ্যা দিলে শব্দটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য হারিয়ে যায়। যারা আজ ক্ষমতার বাইরে থেকে কর্তৃত্ববাদের অভিযোগ তুলছেন, তাদের কাছেও জনগণের প্রশ্ন থাকে—ক্ষমতায় গেলে তাঁরা কি সত্যিই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করবেন, নাকি পুরনো ব্যবস্থার ভেতর শুধু নতুন মুখের রূপান্তর ঘটবে?
বিরোধী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। আইনগতভাবে রাজনীতি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণই গণতান্ত্রিকতার একমাত্র প্রমাণ নয়; তা অর্জিত হয় ধারাবাহিক রাজনৈতিক আচরণের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ইতিহাস দলটির জন্য একটি বাড়তি রাজনৈতিক দায় তৈরি করে। জামায়াতকে যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়, তবে ক্ষমতায় না গিয়েও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সদ্ব্যচ্ছতার প্রমাণ দেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুরু থেকেই পরিবারতন্ত্র ও দখলদারিত্বের রাজনীতির বাইরে এসে ‘নতুন রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ যখন তারা জামায়াতসহ পুরনো ধাঁচের জোটের সঙ্গে রাজপথে হাঁটছে, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—রাজনৈতিক কৌশলের নামে সেই পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হলে ‘নতুন রাজনীতির’ স্বকীয়তা কোথায় রইল?
বাইরের প্রভাবের শঙ্কা
সামগ্রিক এই অস্থিরতার মধ্যে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক প্রভাবের বিষয়টিও উঠে আসছে। অতীতে মালয়েশিয়ার পিএএস (PAS) নেতা হাদি আওয়াংয়ের দেওয়া বিদেশি হস্তক্ষেপের মন্তব্য কিংবা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘিরে নানা আলোচনা সার্বভৌমত্বের ওপর বৈশ্বিক প্রভাবের ঝুঁকি মনে করিয়ে দেয়। দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার পথ কেমন হবে, তা বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণভাবেই নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
অলি আহমদের করা ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ডিসেম্বরে কোনো পরিবর্তন আসবে, নাকি এটি অতীতের অন্যান্য রাজনৈতিক হুমকির মতোই রয়ে যাবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে ডিসেম্বরের রাজনৈতিক ফলাফলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো পদ্ধতির।
গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্বাচনের আগেই যদি রাজপথে ফল নির্ধারিত হয়ে যায় আর নির্বাচন কেবল তাতে আনুষ্ঠানিক সীলমোহর দেয়, তবে ক্ষমতার আসল সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে—জনগণ, নাকি রাজপথ? আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই।

আপনার মতামত লিখুন :