ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শিল্পের নামে নদী দখল, মেঘনার ২৪১ একর জমি উদ্ধারের সুপারিশ

আমার ক্যাম্পাস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬

শিল্পের নামে নদী দখল, মেঘনার ২৪১ একর জমি উদ্ধারের সুপারিশ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর প্রায় ২৪১ একর জমি দখলের অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পেয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। মেঘনা গ্রুপের সাতটি প্রতিষ্ঠান নদীর ২৪১ দশমিক ২৭ একর জমি দখল করেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় দুই বছর ধরে সরেজমিন তদন্ত শেষে ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদনটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দখল করা জমির মধ্যে ৮৪ দশমিক ৭৭ একর এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা ও মূল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৫ দশমিক ৫ একর জমিতে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

দখল করা নদীর জমি দ্রুত উদ্ধার করে মেঘনার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে নদী রক্ষায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আলাউদ্দিন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে জেলা প্রশাসন নদীর জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেবে।

তদন্ত কমিটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে কাজ শুরু করে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে একপর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলেও পরে তা আবার শুরু হয়। কমিটির সদস্যরা সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যের বাজার, হোসেনপুর ও পিরোজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।

তদন্তে চর রমজান, সোনাউল্লাহ, পূর্ব দামোদরদী, পশ্চিম দামোদরদী, দুধঘাটা, টেঙ্গরচর, ছয়হিস্যা, নরসুলদী, আষাঢ়িয়ারচর ও ঝাউচর এলাকায় নদীর জমি ভরাট করে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস, সুগার রিফাইনারি, ফ্রেশ সুগার, কেমিক্যাল কারখানা ও ফ্রেশ সিমেন্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করে কমিটি। এসব স্থাপনার কয়েকটি নদীর মূল ভূমি, তীরবর্তী এলাকা ও প্লাবনভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মেঘনা নদীর শাখা মারাখালী নদীর উত্তর ও দক্ষিণ তীর থেকে নদীর ভেতরে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত দখলের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় নদীর জমি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর, স্থাপনা ও জেটি নির্মাণের তথ্যও পাওয়া গেছে।

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নদীর জমি ভরাটের ফলে মেঘনার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে নদী ও আশপাশের জলাভূমির পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নিম্নাঞ্চলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভূমি রেকর্ড পর্যালোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে কমিটি। ভূমি অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, সিএস রেকর্ডে মেঘনা গ্রুপের দখলে থাকা অনেক জমিকে নদীর জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। আরএস রেকর্ডে কিছু জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মেঘনা গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জেটি নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য বিআইডব্লিউটিএর অনুমতির বিষয়টিও তদন্তে আসে। তবে নদীর জমিতে স্থাপিত দুটি জেটির লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে। তবে নদীর জমি বা প্লাবনভূমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সেখান থেকে তরল বর্জ্য নদীতে পড়লে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

নদীর জমি উদ্ধার ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে তদন্ত কমিটি ১২টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে দ্রুত নদীর জমি চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন তাঁদের হাতে এখনো পৌঁছায়নি। তবে এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে সভা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইতোমধ্যে মদিনা গ্রুপের দখলে থাকা নদী ও নদীতীরবর্তী সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দখলের বিষয়ও তালিকাভুক্ত করে নদীর জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!