আমি তখন প্রথম শ্রেণির ছাত্র। বয়সে ছোট হলেও চারপাশের অস্থিরতা, ভয়ের আবহ সবকিছু মিলিয়ে তখনকার পরিস্থিতি শিশুমনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। আব্বা ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। সেই সুবাদে আব্বার হাত ধরেই প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া। রাশিদ নামে আমার এক সহপাঠিসহ। সেদিনও আব্বার হাত ধরেই স্কুলে যাওয়া। স্কুলের পথটা ছিল ছোট খালের পাড় ঘেঁষে। আমাদের পরিচিত, অথচ সেদিন তা ছিল ভিন্ন রকম শঙ্কাময়। বড় রাস্তার ধারেই ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। স্তরে স্তরে মাঠির বস্তার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বন্দুকধারী সেনাদের কড়া চোখ, কঠিন মুখ—সব মিলিয়ে এক ভয়াল পরিবেশ।
খালের পাশ দিয়ে বড় রাস্তায় ব্রিজ সংলগ্ন সেনাক্যাম্প থেকে একজন হঠাৎ করেই আমাদের থামালো। আমি তখনো বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। আব্বাকে ঘিরে ধরে শুরু হলো উর্দুভাষায় প্রশ্নবাণ। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, তিনি কী করেন—প্রশ্নের পর প্রশ্ন। আব্বার কণ্ঠে আমি তখনো দৃঢ়তা টের পাই। তিনি শান্তভাবে উর্দু ভাষায় বললেন, তিনি একজন শিক্ষক, আর আমি তাঁর ছাত্র—তাঁর সন্তান। কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখে ভয় ছিল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল আত্মমর্যাদার দৃঢ়তা।
একজন পাকিস্তানি সেনা আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল—আমি কোন শ্রেণিতে পড়ি। কাঁপা কণ্ঠে বললাম, “ওয়ানে” সেই মুহূর্তে হয়তো তারা বুঝেছিল, আমরা তাদের কোনো হুমকি নই। শিক্ষক ও ছাত্র, পিতা ও পুত্র এই দুই পরিচয় যেন সেদিন আমাদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের যেতে দেওয়া হলো বিদ্যালয়ের দিকে। আমরা বেঁচে ফিরলাম, মুক্তি পেলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তের আতঙ্ক, অপমান আর অনিশ্চয়তা আজও স্মৃতির অ্যালবামে জ্বলজ্বল করে।
১৯৭১ মানে শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি বছর নয়। ’৭১ মানে হাজারো শিশুর ভীত চোখ, অসংখ্য বাবার নির্ভীক ভান, মায়ের নিঃশব্দ কান্না। একজন প্রাইমারি শিক্ষক সেদিন শুধু শিক্ষক ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক অনাবৃত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর হাতে বন্দুক ছিল না, ছিল চক-ডাস্টার, ছিল শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষাই ছিল পাকিস্তানি দখলদারদের চোখে সবচেয়ে বড় ভয়।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, পরিচয় শুধু নাম বা পেশা নয়—পরিচয় আদর্শ। একজন শিক্ষক যখন প্রশ্নবাণের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের পেশা ও সন্তানের পরিচয় তুলে ধরেন, তখন তিনি আসলে মানবতার পক্ষেই দাঁড়ান। সেই মানবতাই আমাদের স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল।
আজ আব্বা প্রয়াত। স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালে মনে হয়—সেই শিশুটি বেঁচে গিয়েছিল বলেই আজ ইতিহাস লেখা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু কত শিশু, কত শিক্ষক, কত সাধারণ মানুষ সেই সুযোগ পায়নি। তাঁদের রক্তে লেখা স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। তাই ’৭১-এর স্মৃতি কেবল আবেগ নয়, দায়িত্বও। দায়িত্ব—স্বাধীনতাকে ধারণ করা, শিক্ষাকে সম্মান করা, আর অন্যায়ের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো।
স্মৃতির এলবামে ’৭১ তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি একটি জাতির আত্মকথা। যেখানে একজন শিক্ষকের সাহস, একটি শিশুর সরল পরিচয়—একটি পরিবারের মুক্তির গল্প হয়ে ওঠে। আর সেই গল্পই আমাদের বলে যায়—স্বাধীনতা কখনো হঠাৎ আসে না, তা জন্ম নেয় অসংখ্য ছোট ছোট সাহসী মুহূর্তে।
লেখক: শিক্ষক

আপনার মতামত লিখুন :