ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশের মানবাধিকার কতটা ফিরে এসেছে?

আহমেদ শরীফ

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১১, ২০২৫

বাংলাদেশের মানবাধিকার কতটা ফিরে এসেছে?

শেখ হাসিনা সরকার ছাত্র ও জনতার বড় আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ে গত বছর। এরপর অনেকে ভাবলো, এবার হয়তো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে। মানুষ আশা করল, মানবাধিকারও নতুন করে প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু সে আশার সাথে বাস্তবতা মিলল না। কারণ যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিল, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে, তারা পরবর্তী ষোলো মাসে ভিন্ন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করল। এই ব্যবস্থা গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতির বিপরীত পথে গেল। সংবিধান অকার্যকর হলো। আইন হয়ে উঠল প্রতিহিংসার যন্ত্র। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কঠোরভাবে দমন হলো। বিচারব্যবস্থা রাস্তায় দাঁড়ানো জনতার চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করল। সব মিলিয়ে দেশ গণতান্ত্রিক সংকটে নয়, বরং গণতান্ত্রিক অস্তিত্ব সংকটে পড়ল।

ইন্টার পার্লামেন্টারিয়ান ইউনিয়নের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বজুড়ে এমপিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়লেও বাংলাদেশের অবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিশোধ আজ নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরীর পরিস্থিতি তার বড় উদাহরণ। তিনি আগে IPU মানবাধিকার কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। আজ তিনি চিকিৎসাজনিত গুরুতর সংকটে কারাগারে। ২৩ অক্টোবর ২০২৫-এর IPU রেজোলিউশন বলছে, বাংলাদেশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার, স্বচ্ছতার অভাব, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বাধা দেওয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকে সরকারি নীতি হিসেবে ব্যবহার করছে।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (ACHR) সবচেয়ে বিস্তারিত নথি প্রকাশ করেছে। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ষোলো মাসে সংবিধানের প্রায় সব মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। আইনের শাসনের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ভয় ও প্রতিশোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাগরিকের নিরাপত্তা আজ আর সংবিধানের হাতে নেই। বরং রাজনৈতিক শক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

সবচেয়ে বড় সংকট দেখা গেছে কল্পিত মামলার বন্যায়। সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের সমতা ও নিরাপত্তার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে তা আর কার্যকর নেই। অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি মানুষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলার শিকার। এর মধ্যে ৮০ হাজারের বেশি নামীয়, এবং চার লাখেরও বেশি অজ্ঞাতনামা আসামি। এমনকি ৩৪৪ সাবেক এমপির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে শেখ হাসিনার নামও আছে। অভিযোগ—এক শ্রমিককে হত্যাচেষ্টা। কিন্তু এসব মামলার অনেকটাই ভুয়ো। বহু বাদীকে পাওয়া যায় না। কেউ কেউ জানেনই না যে তার নামে মামলা হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, মামলা এখন বিচার নয়, বরং ভয় দেখানোর অস্ত্র।

মামলার পাশাপাশি বাড়ছে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বন্দিদের ওপর অমানবিক আচরণের নতুন ঢেউ দেখা গেছে। আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ৪০টি ক্রসফায়ার হয়েছে। বিচারিক হেফাজতে মারা গেছে ৮৮ জন। এসব সংখ্যা শুধু তথ্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের নির্মম চিত্র। যেখানে মানবিক অধিকার রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব, সেখানে মানুষই সরকারের ভয়ভীতির লক্ষ্য।

বিপুল গ্রেপ্তার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। ‘ফ্যাসিবাদে জড়িত’ অভিযোগে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের অনেকে এখনো বন্দি। সন্ত্রাসবিরোধী আইন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই নতুন মামলা হয়। অনেক বয়স্ক বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সাহিত্যিক বা সাংবাদিককে শুধু একটি সভায় কথা বলার জন্য সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে আটক করা হয়েছে। যখন শিক্ষক, শিল্পী ও কলমধারী মানুষ রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহভাজন হয়ে ওঠেন, তখন বোঝা যায় উদ্দেশ্য বিচার নয়; উদ্দেশ্য নীরবতা চাপিয়ে দেওয়া।

দমন-পীড়নের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর। আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত ২,৪৮৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুর্গাপূজায় বহু মন্দির ভাঙচুর হয়েছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মারমা জনগোষ্ঠীর ওপর গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়। আরও দশজন আহত হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, পাহাড়ে আজও আদিবাসীরা নিরাপদ নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে রক্ষা করা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

বিচারব্যবস্থাও একই সময়ে বড় সংকটে পড়ে। সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার জনতার চাপ দেখিয়ে প্রধান বিচারপতি ও আরও ২১ জন বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করে। কোনো তদন্ত হয়নি। কোনো অভিশংসন হয়নি। বিচারব্যবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে আইন নয়, জনতার শোরগোল বিচার নির্ধারণ করে। এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত।

মে ২০২৫-এ আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করা হয়। আদালত আগে এই দাবির রিট খারিজ করেছিল। কিন্তু সরকার নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে অনেক বড় রাজনৈতিক শক্তিকে এক আঘাতে নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলে দেশে বহুদলীয় রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়ে যায়।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কঠিন। ১,০৮৭ জন সাংবাদিক মামলা, হামলা বা গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন। সাইবার সিকিউরিটি আইনে আটক হয়েছেন অন্তত ৪৪ জন। সংবাদমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করা আজ প্রায় অপরাধ। সাংবাদিকেরা ভয়ে কাজ করেন। যারা সত্য বলতে চেয়েছেন, তাদের ওপর মামলা ও হামলা নেমে এসেছে।

ষোলো মাস শেষে দেখা গেল, অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তারা বলেছিল জবাবদিহি, স্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, মানবাধিকার। কিন্তু বাস্তবে ঘটল গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ, ভয়, আইন ভাঙা, এবং বিচারব্যবস্থার অবক্ষয়। এটি শুধু ব্যর্থতা নয়। এটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ক্ষয় করার প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের মানুষ আরও ভালো ভবিষ্যৎ পাওয়ার যোগ্য। তারা সহিংসতা নয়, অধিকার চায়। তারা ভয় নয়, সমতা চায়। তারা চায় এমন একটি দেশ, যেখানে মর্যাদা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!