বর্তমানে প্রযুক্তি জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই’র নতুন ধারণাগুলো—যেমন জেনারেটিভ এআই বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLMs)—বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এখন চ্যাটবট, এআই প্রম্পটের মাধ্যমে ছবি বা ভিডিও তৈরি, এবং জটিল ডেটা বিশ্লেষণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই অত্যাধুনিক অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মূল ধারণাটি বহু বছরের পুরোনো, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষত ১৯৫০-এর দশকে।
এআই’র ধারণার শিকড় নিহিত রয়েছে গণিত, যুক্তিবিদ্যা এবং দর্শনের শতাব্দীপ্রাচীন গবেষণায়। তবে একটি সুসংগঠিত বিজ্ঞান হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০-এর দশকে। ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং ১৯৫০ সালে তার ‘Computing Machinery and Intelligence’ প্রবন্ধে প্রথম ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ পরিমাপের জন্য একটি পরীক্ষা প্রস্তাব করেন, যা আজ টুরিং টেস্ট নামে পরিচিত। এই পরীক্ষাটি মূলত মেশিনের মানুষের মতো বুদ্ধিমান আচরণ করার ক্ষমতা যাচাইয়ের একটি মানদণ্ড। টুরিং আধুনিক কম্পিউটারের বিকাশে একজন অগ্রণী ব্যক্তি হিসেবে এমন একটি মেশিনের কথা কল্পনা করেছিলেন, যা তার মূল প্রোগ্রামিংয়ের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে পারে।
১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মে ডার্টমাউথ কলেজে আয়োজিত একটি কর্মশালার (ওয়ার্কশপ) মাধ্যমে এআই একটি স্বতন্ত্র গবেষণা ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জন ম্যাকার্থি (John McCarthy), মার্ভিন মিনস্কি (Marvin Minsky)-সহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এইওয়ার্কশপে অংশ নেন। এই সম্মেলনেই জন ম্যাকার্থি প্রথমবার ‘Artificial Intelligence’ বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
ডার্টমাউথ কনফারেন্সের আগেই এআই প্রসেসিং নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। আর্থার স্যামুয়েল ১৯৫২ সালে একটি চেকার্স প্রোগ্রাম তৈরি করেন, যা ছিল প্রথম self-modifying গেম-প্লেয়িং প্রোগ্রাম। তিনিই ১৯৫৯ সালে প্রথম ‘মেশিন লার্নিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ফ্রাঙ্ক রোজেনব্ল্যাট ১৯৫৭-৫৮ সালে পারসেপট্রন তৈরি করেন, যা ছিল প্রাথমিক আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক। অন্যদিকে, জোসেফ উইজেনবম ১৯৬৫ সালে ‘ELIZA’ নামক প্রথম চ্যাটবট তৈরি করেন, যা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP)-এর ধারণাকে সামনে আনে।
১৯৭০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সময়টি এআই গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গবেষকেরা এই সময় সাধারণ বুদ্ধিমত্তা তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে এসে নির্দিষ্ট ও ব্যবহারিক সমস্যা সমাধানে মনোনিবেশ করেন। এই সময় এক্সপার্ট সিস্টেমের উত্থান ঘটে। এতে মানুষের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কম্পিউটারে এনকোড করা হতো। এটি ছিল এআই-এর প্রথম সত্যিকারের সফল বাণিজ্যিক প্রয়োগগুলোর মধ্যে অন্যতম।
তবে এআই গবেষণা দুটি বড় মন্দার সম্মুখীন হয়, যা ‘এআই উইন্টার’ নামে পরিচিত। এক্সপার্ট সিস্টেমগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ছিল ব্যয়বহুল এবং বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ করা কঠিন ছিল। তবু এই সময় গবেষকেরা পরিসংখ্যানভিত্তিক মেশিন লার্নিং পদ্ধতির দিকে মনোযোগ দেন, যা ২০০০-এর দশকের উত্থানের ভিত্তি তৈরি করে।
বিগত ৭০ বছর ধরে এআই গবেষণা বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার মধ্যে অর্থায়ন বন্ধের ঘটনাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রযুক্তিগত তিনটি বড় অগ্রগতির কারণে এআই ধারণায় বিপুল পরিবর্তন আসে—বিগ ডেটা, অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং পাওয়ার এবং ডিপ লার্নিং।
২০০০-এর দশকের শেষভাগে ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়; যা আজকের এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণের ভিত্তি। অন্যদিকে, গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU)-এর মতো শক্তিশালী হার্ডওয়্যারের কারণে কম্পিউটেশনের গতি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ২০১০-এর দশকের গোড়ার দিকে পারসেপট্রনের মতো পুরোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক ধারণা থেকে ডেভেলপ হওয়া ডিপ লার্নিং (একাধিক স্তরের নিউরাল নেটওয়ার্ক) ডেটা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জটিল প্যাটার্ন শেখার ক্ষমতা অর্জন করে। এই তিনটি ধারণা একত্রিত হয়ে জেনারেটিভ এআই-এর মতো নতুন উদ্ভাবনের পথ প্রশস্ত করে।
জেনারেটিভ এআই, প্রাথমিক NLP-র ধারণা (যেমন ELIZA)-কে আরও উন্নত করে তৈরি হয়েছে। আজকের LLMs—যেমন ChatGPT বা Gemini প্রচুর পরিমাণ টেক্সট ডেটায় প্রশিক্ষিত হয়ে প্রবাবিলিটির মাধ্যমে নতুন ও সুসঙ্গত কনটেন্ট তৈরি করছে। তাদের সাফল্যের মূলে রয়েছে নিউরাল নেটওয়ার্ক, বিশেষত ট্রান্সফরমার আর্কিটেকচার, যা পুরোনো ধারণাগুলোকেও অভূতপূর্বভাবে স্কেল করতে সক্ষম করেছে।
এআই এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এর উন্নয়নের গতি আরও দ্রুত হতে পারে। ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড এবং মেটা-র মতো কোম্পানিগুলো এমন এক এআই তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যা মানুষের মতো প্রায় যেকোনো জ্ঞানভিত্তিক কাজ করতে পারবে, যাকে বলা হয় আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI)। ভবিষ্যতে মাল্টিমোডাল এআই—যা টেক্সট, ভয়েস, ছবি ও ভিডিওসহ একাধিক ডেটা টাইপ বুঝতে ও প্রসেস করতে পারে; স্ট্যান্ডার্ড প্রযুক্তি হয়ে উঠবে। এটি মানুষের সঙ্গে কম্পিউটারের যোগাযোগকে আরও সহজবোধ্য করে তুলবে।
জেনারেটিভ এআইসহ সমস্ত এআই টুলস ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে আরও স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে। এটি স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি এবং শিক্ষা ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। তবে এটি কর্মসংস্থানের সংকটও তৈরি করতে পারে, যার জন্য কর্মজীবীদের নতুন দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য হবে।
এআই-এর দ্রুত অগ্রগতির ফলে এর নৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রক নীতিমালা নিয়ে আলোচনাও তীব্র হচ্ছে। সরকার ও গবেষকেরা নিরাপত্তা, পক্ষপাত এবং এআই’র সম্ভাব্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন নিয়ম তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান চমকপ্রদ টুলগুলো কোনো হঠাৎ আবিষ্কার নয়, বরং টুরিং, ম্যাকার্থি ও রোজেনব্ল্যাটের মতো দূরদর্শী গবেষকদের ১৯৫০-এর দশকে শুরু করা গবেষণার ফল। নিউরাল নেটওয়ার্ক, মেশিন লার্নিং এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের পুরোনো ধারণাগুলো আজ বিপুল পরিমাণ ডেটা ও আধুনিক কম্পিউটিং শক্তির কারণে এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। অতীতে বপন করা বীজগুলোই আজকের জেনারেটিভ এআই’র বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
এ প্রযুক্তি যেমন কর্মপদ্ধতি বদলে দিচ্ছে ও বিভিন্ন শিল্পে বিপ্লব আনছে, তেমনি ভবিষ্যতের এআই আরও স্মার্ট, মাল্টিমোডাল এবং মানুষের জন্য আরও উপযোগী হবে বলে আশা করা যায়, যা এজিআই উন্নয়নের পথে এক অনন্য পদক্ষেপ। এআই’র এই যাত্রা প্রমাণ করে, প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অগ্রগতি ঘটে পুরোনো, দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ে।
লেখক: সিইও, এসিই আইটি; স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্ট, এডুসফ্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড।

আপনার মতামত লিখুন :