ঢাকা রবিবার, ০৮ মার্চ, ২০২৬

ইরানের সর্বনাশ, ভারতের পৌষ মাস!

আমার ক্যাম্পাস ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২৬

ইরানের সর্বনাশ, ভারতের পৌষ মাস!

গত বছর ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপের পর ফাঁটল দেখা যায় ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুখ ফিরিয়ে নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই ফাঁটলে কিছুটা প্রলেপ দিচ্ছে। এই তিন দেশের যুদ্ধে লাভ হচ্ছে ভারতের। আর সে সুযোগ করে দিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট!

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ থমকে যায়। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহনের পথ এই হরমুজ। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের হামলার পর কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বন্ধ হয়ে যায় জ্বালানি তেল উৎপাদন। এরই জেরে বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতি মেটাকে ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে আমেরিকা।

যে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আনার জন্য ভারতের ওপর বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেছিলেন ট্রাম্প, সেই রাশিয়ার কাছ থেকেই এবার তেল কিনতে বললেন তিনি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, এই পিছু হটা মার্কিন নীতির পেছনে একটি কঠিন সত্য লুকিয়ে আছে। আর তা হলো, ভারতকে উপেক্ষা করা যায় না। মার্কিন ট্রেজারি বিষয়ক মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতকে “খুব ভালো অভিনেতা” বলে উল্লেখ করেছেন।

স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটনের অনুরোধে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার জন্য ভারত সাড়া দিয়েছিল। এখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় বিশ্ব বাজারে সরবরাহের চাপ কমাতে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে ভারতকে।

ভারত কি তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করেছিল?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম ২০২৪ সালের গ্রীষ্মের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–ভারত রাশিয়ান তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ট্রাম্পের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ভারত রাশিয়ান তেল কিনে গেছে।

গত মাসে ট্রাম্প একতরফাভাবে দাবি করেছিলেন, একটি প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে ভারত, যাতে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ১৮%-এ নামিয়ে আনবে। কিন্তু ভারত এটি নিশ্চিত করেনি।

২০২২ সালে মস্কো ইউক্রেনে আক্রমণের পর চীন ও ভারত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হয়ে ওঠে। ভারত রাশিয়ান তেল আমদানির প্রায় ৪০% নিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ভারত আমদানি কিছুটা কমিয়েছে। জানুয়ারিতে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ২১%-এ নেমে এসেছিল, কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে আবার ৩০%-এ উঠেছে। সুতরাং ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করেনি।

এই ছাড়ে ভারতের কী লাভ?

ভারত তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০% আমদানি করে। এর ৪০-৫০% মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। স্ট্রেইট অব হরমুজ বন্ধ হওয়ায় ভারত দ্রুত রাশিয়ান তেল কিনে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে পারবে এবং তেলের বিল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।

ব্লুমবার্গের খবর অনুসারে, ভারতীয় রিফাইনারিরা ইতিমধ্যে ১ কোটির বেশি ব্যারেল রাশিয়ান তেল কিনেছে। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ট্যাঙ্কারে প্রায় ১.৫ কোটি ব্যারেল তেল আটকে আছে, যা এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছাতে পারে।

ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদ্বীপ সিং পুরি বলছেন, ভারতের কাছে যথেষ্ট ক্রুড স্টক আছে, যা ২৫ দিন চলবে। এবং পেট্রোল-ডিজেল স্টক আরও ২৫ দিনের। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত তেল আনার সময় মার্কিন নৌবাহিনী সুরক্ষা দেবে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন ৩০ দিনের ছাড় দিল?

মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলছেন, “আমরা আমাদের বন্ধু ভারতকে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ান তেল কিনতে বলেছি। এতে তেল ভারতীয় রিফাইনারিতে প্রবেশ করবে এবং অন্যান্য বিশ্ব রিফাইনারির ওপর চাপ কমবে।”

দক্ষিণ এশিয়ার আশপাশে বড় পরিমাণে রাশিয়ান তেল ট্যাঙ্কার রয়েছে। ভারত দ্রুত এগুলো কিনলে তা বাজারে আসবে, সরবরাহ বাড়বে এবং দাম স্থিতিশীল হবে। রাইট বলেছেন, “এতে স্টোর করা তেল দ্রুত ভারতীয় রিফাইনারিতে ঢুকবে এবং অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমবে।"

আরেকটি দিক হলো, ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হলেও চতুর্থ বৃহত্তম রিফাইনার এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানিকারক। ২০২২ সাল থেকে ভারত সস্তা রাশিয়ান তেল কিনে রিফাইন করে পশ্চিমা বাজারে বিক্রি করেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে।

ভারতের রিফাইনারি রাশিয়ান ক্রুড প্রক্রিয়াকরণে অভ্যস্ত। এ ছাড়া হরমুজের ওপর নির্ভর না করে ভূমধ্যসাগর, সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর দিয়ে রাশিয়ান তেল ভারতে আসতে পারে।

এই ঘটনা ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার ভূমিকাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রও এখন ভারতের এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। আর সে কারণে ভারত ১ মাসের জন্য এই অনুমতি পেল। সংকট বাড়লে হয়তো এই অবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। সূত্র: চরচা

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!