ঢাকা শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

ফরিদপুরের একটি ফসলি মাঠ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৫

ফরিদপুরের একটি ফসলি মাঠ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান!

ছবিঃ সংগৃহীত

পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেখা রয়েছে—কর্কটক্রান্তি, মকরক্রান্তি ও বিষুবরেখা। আর উত্তর-দক্ষিণে রয়েছে চারটি দ্রাঘিমা রেখা—শূন্য ডিগ্রি, ৯০ ডিগ্রি, ১৮০ ডিগ্রি ও ২৭০ ডিগ্রি। এই সাতটি রেখা পরস্পর ছেদ করেছে ১২টি বিন্দুতে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ১২টি বিন্দুই পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ১২টি বিন্দুর মধ্যে ১০টি সাগর বা মহাসাগরে এবং একটি সাহারা মরুভূমিতে পড়েছে, যেখানে মানুষের পক্ষে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। একমাত্র একটি বিন্দু পড়েছে শুকনো জমিতে—বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নূরুল্লাগঞ্জ ইউনিয়নের ভাঙ্গারদিয়া গ্রামের একটি ফসলি মাঠে। ফলে এই স্থানটিকেই পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই অনন্য অবস্থানকে স্মরণীয় করে রাখতে আগের সরকার ভাঙ্গারদিয়া গ্রামে একটি মানমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। বিল ধোপডাঙ্গা মৌজার প্রায় পাঁচ একর কৃষিজমি—যা স্থানীয় সোবহান মাতুব্বর, বারেক মাতুব্বর, ইকবাল মাতুব্বর, কুটিপাগলা, জাকির হোসেন, ইউসুফ মাতুব্বর, আজিজুল মাতুব্বর, শাহজাহান শেখ ও মোফাজ্জল হোসেনের মালিকানাধীন ছিল—প্রাথমিকভাবে মানমন্দির প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত হয়।

স্থানীয়রা জানান, আন্তর্জাতিক মানের মানমন্দির ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মিত হলে কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, জমির মূল্য বাড়বে, ফলে এলাকার সাধারণ মানুষও সরাসরি উপকৃত হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা বারেক মাতুব্বর বলেন,
“আমরা আগে বুঝতেই পারিনি, আমাদের জমিই পৃথিবীর এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা! পরে প্রশাসনের লোকজন এসে আমাদের বিষয়টা জানায়। আমরা সবাই সরকারকে জমি দিতে রাজি হয়েছিলাম—শুধু চাই, এখানে যেন মানমন্দির হয়।”

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাকাশ অবলোকন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প’ অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরকে। ২০২৪ সালের জুন মাসের মধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্য ছিল, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৩ কোটি ৩৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল কর্কটক্রান্তি ও ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার সংযোগস্থলে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে উৎসাহিত করা এবং শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য গবেষণার সুযোগ তৈরি করা। এছাড়া সেখানে আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন ওয়ার্কশপ আয়োজনের পরিকল্পনাও ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর এ প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়।

ফরিদপুরের ভাঙ্গারদিয়া গ্রামের এই অনন্য অবস্থান সম্পর্কে প্রথম জানানো হয় বিজ্ঞান লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘একটি স্বপ্ন’ শিরোনামের নিবন্ধে।

ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক স্বপন কুমার হালদার বলেন,
“কর্কটক্রান্তি ও ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমার ছেদবিন্দু আমাদের দেশে পড়েছে—এটা বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের মানমন্দির হলে দেশের মর্যাদা বাড়বে। যেমনভাবে গ্রীনিচ মানমন্দির বিশ্বজুড়ে পরিচিত, তেমনভাবেই এই স্থানও বিশ্বমানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।”

নূরুল্লাগঞ্জ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. ছরোয়ার মাতুব্বর বলেন,
“সরকার যখন প্রকল্প শুরু করেছিল, তখন আমরা জমি দিতে রাজি হয়েছিলাম। কয়েকবার উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকও হয়। পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখি নাই। এখন চাই, এই জায়গায় মানমন্দির স্থাপন হোক—এতে আমাদের এলাকার উন্নয়ন হবে।”

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন,
“ভাঙ্গার ওই এলাকায় মানমন্দির স্থাপন করা সম্ভব হলে অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার বড় পরিবর্তন আসবে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, পাশাপাশি বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বিরল স্থানটির মালিক হিসেবে গর্ব করতে পারবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমি স্থানীয়দের মতামত নিয়ে যদি দেখি তারা প্রকল্পটি পুনরায় চান, তাহলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব আকারে পাঠানো হবে।”

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!