১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ৩৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। তাঁর মৃত্যু এমন এক সময়ে এলো যখন ইরান সম্ভবত ১৯৮৯ সালের পর থেকে তার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল। মাসের পর মাস ধরে CIA খামেনির গতিবিধি এবং রুটিন ট্র্যাক করছিল এবং জানতে পেরেছিল যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে খামেনি নিজে উপস্থিত থাকবেন।
সেই বৈঠককে কেন্দ্র করেই হামলার পরিকল্পনা করা হয়। এর মানে হলো, ইরানের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল। দশকের পর দশক ধরে মোসাদ ও CIA ইরানের নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সামরিক কমান্ডার পর্যন্ত অনেককে হত্যা করেছে এতে বোঝা যায় ইরানের ভেতরে গভীর অনুপ্রবেশ ছিল।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের মূল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা করে এবং বিজ্ঞানী ও জেনারেলদের হত্যা করে। ইরান পাল্টা হামলা করলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে আঘাত হানে। এই যুদ্ধের পর থেকে ইরান কার্যত পঙ্গু হতে শুরু করে।
ইরানের "অ্যাক্সিস" ভাঙতে শুরু করে অক্টোবর ৭-এর হামলার পর থেকে। ইসরায়েল প্রথমে হামাসের উপর যুদ্ধ শুরু করে, তারপর হেজবোল্লাহকে ধ্বংস করে যা ছিল ইরানের সবচেয়ে মূল্যবান প্রক্সি। সিরিয়ায় আসাদের পতন হয় ডিসেম্বর ২০২৪-এ। একে একে ইরানের সব সামনের সারির ঢাল খসে পড়লে ইরান নিজেই সরাসরি হামলার মুখে এসে পড়ে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভে ইরান সরকার ৭,০০০-এরও বেশি প্রতিবাদকারীকে হত্যা করে যা আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপের হুমকি ডেকে আনে।
নভেম্বর ২০২৫-এ প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সংসদে সতর্ক করেন যে খামেনির কোনো ক্ষতি হলে ভেতরের বিভিন্ন গোষ্ঠী একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে যাবে এবং বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র নিজেই জানত যে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভঙ্গুর।
টুয়েলভ-ডে ওয়ারের সময় অভিযোগ ছিল যে সামরিক কমান্ডাররা যুদ্ধের বাস্তবতা খামেনির কাছ থেকে লুকিয়ে রাখছিলেন এবং মানসিক চাপে তিনি কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সরে আসেন। নেতৃত্বের এই অনুপস্থিতি সংকটকালীন সমন্বয়কে অসম্ভব করে তুলেছিল।
সর্বোচ্চ নেতার পদে কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত উত্তরসূরি ছিলেন না, কারণ ১৯৮৯ সালে ভাইস সুপ্রিম লিডারের পদ বিলুপ্ত করা হয়েছিল। মৃত্যুর আগে খামেনি তাঁর উত্তরসূরি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা করেননি। এই শূন্যতা শুধু শাসনগত সংকট তৈরি করেনি বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে দেয়নি।
দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত করে রেখেছিল। জনগণের একটি বড় অংশ শাসনের বিরুদ্ধে ছিল, ফলে খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে ইরানের ভেতরে কিছু নাগরিক রাস্তায় বেরিয়ে উদযাপন করতে শুরু করে ইসফাহান, কারাজ, কেরমানশাহ, শিরাজসহ বিভিন্ন শহরে।
খামেনির মৃত্যু কোনো একটি ব্যর্থতার ফল নয়। এটি ৩৬ বছরের শাসনের সমস্ত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রক্সি রাজনীতির ফাঁদ এবং কৌশলগত বিচ্ছিন্নতার সম্মিলিত পরিণতি। যেমনটি বিশ্লেষকরা বলেছেন, খামেনিকে হত্যা করা মানেই শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নয় কারণ আসল শক্তি হলো IRGC, যারা এখনো টিকে আছে। সূত্র: নবোদয়

আপনার মতামত লিখুন :