ঢাকা বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কি ‘অতিরিক্ত সরল’?

ক্লিফোর্ড স্মিথ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কি ‘অতিরিক্ত সরল’?

ইরানে ‘ইসলামপন্থি’ শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য সামরিক হামলা নিয়ে যত হৈচৈ চলছে, তাতে একটি ভিডিওর গুরুত্ব সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। ভিডিওটি এক্স হ্যান্ডেলে  (সাবেক টুইটার) ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায়-ডজনখানেক বাংলাদেশি সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ডিজিটাল ছবিতে চুমু খাচ্ছেন। বিশ্বের অন্যতম সহিংস ধর্মতান্ত্রিক শাসকের প্রতি বাংলাদেশের কিছু তরুণের এই প্রকাশ্য সমর্থন, যিনি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নিজের দেশের হাজার হাজার মানুষকে (আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি) কেবল প্রতিবাদ করার অপরাধে হত্যা করেছেন-একদিকে শিউরে ওঠার মতো, অন্যদিকে ভীষণ বিদ্রূপাত্মক।

শিউরে ওঠার মতো, কারণ এটি একজন গণহত্যাকারীর উদযাপন। আর বিদ্রূপাত্মক, কারণ বাংলাদেশে বর্তমানে যা ঘটছে, এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিক্রিয়া, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।

সহজ করে বললে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হলো মূলত ইসলামপন্থী ১১টি দলের একটি জোট, যার নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ ইসলামপন্থী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামী। আর রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে-এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, এবং বলা যায় পুরো বিশ্বই কার্যত ঘুমিয়ে আছে।

১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। প্রথমত, কারণ এটি আদৌ ঘটেছিল; দ্বিতীয়ত, কারণ এটি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের সবচেয়ে বিষাক্ত ও বিপজ্জনক বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে প্রমাণিত হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যম যাকে গান্ধীর মতো এক ‘পবিত্র মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরেছিল, সেই আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি পরে বিশ্বের অন্যতম নিষ্ঠুর ও দমনমূলক স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। খোমেনিকে একটি নিরীহ সামাজিক আন্দোলনের নেতা হিসেবে ভুলভাবে মূল্যায়ন করা ছিল প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের শাসনামলের অন্যতম বড় ভুল, এবং এর ফলেই সৃষ্ট জিম্মি সংকট তার দ্বিতীয় মেয়াদের সম্ভাবনা ধ্বংস করে দেয়। সেই বিপ্লবের পরিণতি আজও পুরো বিশ্বকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হয়তো একই ধরনের একটি গতিপথ তৈরি হচ্ছে।

শেখ হাসিনার পতনের পরপরই পশ্চিমা গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে যে বিকৃতি দেখা গেছে, তা বিষয়টি স্পষ্ট করে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিবেদক করিশমা মেহরোত্রাকে নিয়ে করা একটি পডকাস্টে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে তুলে ধরা হয় দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ হিসেবে।

এই বর্ণনা পুরোপুরি কাল্পনিক ছিল না। হাসিনা ছিলেন কঠোর শাসক, এবং তার দল বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিত ভোট দমনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল-যা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরেও ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হতো। নিঃসন্দেহে তার সরকার কিছু মাত্রায় দমন-পীড়ন চালিয়েছে, এবং ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে সেটি স্থবির হয়ে পড়েছিল।

তবে পডকাস্টে যেভাবে তার পতনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা এতটাই সরল ও অসম্পূর্ণ ছিল যে বিস্মিত না হয়ে উপায় ছিল না। বারবার “ছাত্র আন্দোলন”-এর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেই ছাত্ররা কারা, এবং মাঠপর্যায়ে তারা কী ভূমিকা রেখেছে-সে বিষয়ে কোনো আলোচনা ছিল না। এতে মনে হতে পারে, তারা যেন ১৯৬৪ সালের মার্কিন দক্ষিণাঞ্চলের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের মতো।

কিন্তু একবারও উল্লেখ করা হয়নি যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরকে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, এবং হাসিনার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া বিক্ষোভে তাদেরই অগ্রণী ভূমিকা ছিল বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। এটাও বলা হয়নি যে, তাদের মূল সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, বাঙালি গণহত্যায় গভীরভাবে জড়িত ছিল। ইসলামপন্থী আন্দোলনের কথা প্রায় একেবারেই আসেনি শুধু বলা হয়েছে, হাসিনা তাদের বিরোধী ছিলেন।

এই সরলতা শুধু ওয়াশিংটন পোস্টেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হাসিনার পতনের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রকাশিত সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে ইসলামী ছাত্র শিবিরকে একেবারেই নিপীড়িত সরকারের নির্দোষ ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরা হয়।

মার্কিন গণমাধ্যমে এই সম্ভাব্য হুমকির প্রতি উদাসীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ওয়েবসাইটে দ্রুত অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত (নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে) একবারও জামায়াতে ইসলামীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমস বা কিছু থিঙ্কট্যাঙ্কের সামান্য উদ্বেগ এই সামগ্রিক প্রবণতাকে বদলায় না যার সঙ্গে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময়কার কভারেজের বিস্ময়কর মিল রয়েছে।

মার্কিন কূটনীতিকরাও প্রকাশ্যে উদাসীন। “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক,”-ওয়াশিংটন পোস্টকে এক অজ্ঞাতনামা কূটনীতিক বলেন এবং সাংবাদিকদের ইসলামী ছাত্র শিবিরের সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানান। “আমি বিশ্বাস করি না জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারবে,”-তিনি বলেন, যদিও এটি দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত লক্ষ্য। তার যুক্তি, যদি তারা এমন কিছু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র “পরের দিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক বসাবে।”

মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিই কি কূটনীতিকদের অবস্থান তৈরি করেছে, নাকি উল্টোটা, তা বলা কঠিন। তবে উভয়েই একই সুরে কথা বলছে। এই মনোভাব ব্যতিক্রম নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার বহু মিত্র দেশ মাসের পর মাস ধরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতির অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা যথার্থই বলেছেন, “জামায়াত এখন মূলধারায় আসতে মরিয়া, এবং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বর্ণনার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিজেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল হিসেবে তুলে ধরতে চায়।” পশ্চিমা গণমাধ্যম ও কূটনীতিকদের অবিশ্বাস—যে জামায়াত ক্ষমতায় এসে ধর্মতান্ত্রিক শাসন কায়েম করতে পারে-প্রমাণ করে যে এই পুনর্ব্র্যান্ডিং সফল হচ্ছে।

একটি সাম্প্রতিক বিতর্ক বিষয়টি স্পষ্ট করে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের একটি X অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়, “নারীদের যখন ঘরের বাইরে কাজ করতে বাধ্য করা হয়, এটি আসলে আরেক ধরনের পতিতাবৃত্তি।” নারীর ভূমিকাকে প্রশংসা করা তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হওয়ায় সমালোচনা শুরু হয়। রহমান দাবি করেন, তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। কিন্তু বেশি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো—তিনি ভুল করে নিজের বিশ্বাসই প্রকাশ করে ফেলেছেন। মনে রাখা দরকার, খোমেনিও ক্ষমতায় আসার আগে বহু নারী-বান্ধব বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেগুলো টেকেনি।

১৯৭১ সালের গণহত্যায় জামায়াতের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এক বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন, দলটি অস্পষ্ট ও সাধারণ ক্ষমাপ্রার্থনা করলেও কখনোই নির্দিষ্ট অপরাধ স্বীকার করেনি। এই অর্ধেক ক্ষমা বিশ্বাসযোগ্য নয়, তবু তা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের আশ্বস্ত করতে যথেষ্ট হয়েছে।

আমি দাবি করছি না যে বাংলাদেশ ইরান হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ইতিহাস আলাদা, ভূরাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন, আর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতা মুহাম্মদ ইউনূস মোটেও খোমেনি নন। এখনও বহু ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি প্রভাবশালী। শেষ পরিণতি অনিশ্চিত।

তবুও বিস্ময়কর যে পশ্চিমা কূটনীতি ও গণমাধ্যম প্রায় লক্ষ্যই করছে না-বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী দুই প্রধান দলের একটি আওয়ামী লীগকে তুলনামূলকভাবে হালকা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অথচ জীবিত স্মৃতির মধ্যেই একটি গণহত্যায় জড়িত দলটি বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখায় কেন এটি বিপজ্জনক: মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড জনপ্রিয় ছিল না, তবুও তারা জিতেছিল, কারণ তাদেরকে দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল।

আশা করা যায়, বাংলাদেশে একটি তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, এবং জনগণ জামায়াত ও তার সহযোগীদের চেয়ে বেশি সহনশীল শক্তিকে বেছে নেবে। সেটি এখনও সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে ‘ইসলামপন্থি সরকার’ আসার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দেওয়া পশ্চিমা গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক গুরুতর ব্যর্থতা। মনে হয়, ১৯৭৯ সালের শিক্ষা অনেকেই এখনো শেখেনি।

লেখক: মিডল ইস্ট ফোরামের ‘ওয়াশিংটন প্রজেক্টের’ পরিচালক। লিসবোন পোস্ট থেকে প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন আহমেদ শারজিন শরীফ।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!