লাঠি হাতে এক ক্ষমতাসীন ব্যক্তির তীব্র মারমুখী আচরণ। সামনে প্রায় ৩০ জন কিশোর-তরুণের কান ধরে অসহায় উঠবস। দুই দিন ধরে এমন একটি ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে কোটি কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর টাইমলাইনে। এ এক চরম বিব্রতকর দৃশ্য। মারমুখী ব্যক্তিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা।
একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল, একসময় বন্ধুরা মিলে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন বাসার কাছে মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘুরতে যেতাম। তৎকালীন ইজারাদারের ভাতিজা ছিল আমাদের এক বন্ধুর বন্ধু। সেই সুবাদে কখনোই বোটানিক্যালে ঢুকতে টিকেট নিতে হতো না। এমনিতে কর্তৃপক্ষের নজরদারি ছিল বেশ কড়া। মূল গেট দিয়ে বিনা টিকেটে প্রবেশ অকল্পনীয়। পকেট গেট কিংবা দেয়াল টপকে ঢুকে পড়া অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিদের কেউ ধরা পড়ে গেলে নাস্তানাবুদ করে ছাড়তো নিরাপত্তারক্ষীরা। তেমনই একদল স্কুল পালানো ছেলেকে একবার পাকড়াও হতে হল গার্ডদের হাতে। তারপর বেশ বকাঝকা, গায়ে হাত তুলবে তুলবে এমন অবস্থা। সর্দার মতো একজন বলছিল, ‘কান ধর, কান ধর শিগগির!’
আমাদের মধ্যস্থতায় ছেলেগুলো নিস্তার পেয়েছিল। গার্ডদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে গার্ডেন থেকে ওদের বেরিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলাম সেদিন।
সর্ব মিত্র নিরাপত্তারক্ষীদের মতোই আচরণ করলেন ওই কিশোর-তরুণদের সঙ্গে। কিন্তু ভুলে গেলেন, ডাকসুর সদস্যপদ মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইজারা না! বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও কোনো পার্ক না! আর ডাকসুর সদস্যপদ মানেই কর্তৃত্ববাদ না!
সর্ব মিত্ররা যে প্যানেল থেকে ডাকসু দখল করেছেন তাদের মধ্যে বিরুদ্ধমত দমনের সীমাহীন প্রবণতা বিদ্যমান। তারা চান সর্বময় অসীম কর্তৃত্ব। লোকে তাদের কথায় উঠবে, তাদের কথাতেই বসবে। কিন্তু এই ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেমানান। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেখার জন্য ‘আগে চান্স পেয়ে দেখাতেই হবে,’— এ ধারণা ভুল। একটি বৃহৎ শিক্ষাঙ্গন থেকে জনসাধারণ নানাভাবে জ্ঞানলাভ করতে পারে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণরত শিক্ষার্থীরা সমাজের অগ্রসর শ্রেণি। সমাজকে পথ দেখানো তাদের দায়। আত্মকেন্দ্রিকতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে বেমানান। দুঃখজনক হলেও সত্য হলো, তারা নেতা হয়েছেন বটে, ছাত্রত্বের ধারণাটুকু অর্জন করেননি। পরিচয়পত্র পেয়েছেন বটে, বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির অর্থ উপলব্ধি করতে পারেননি।
যতদূর জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ একটি উন্মুক্ত জায়গা। যেমন উন্মুক্ত তাদের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। নিরাপত্তা বা পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ চাইলে অবশ্যই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন যেকোনো জায়গায় জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ঢাবি সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত বহু মানুষের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। ওই মাঠে খেলতে খেলতেই বহু কিশোর স্বপ্ন দেখেছে কার্জন হল কিংবা চারুকলায় অথবা আর্টস বিল্ডিংয়ে ক্লাস করার। একটি ত্রাসের সাম্রাজ্য কায়েমের মাধ্যমে সর্ব মিত্র কি বহু কিশোরের স্বপ্ন দেখার পথ রোধ করলেন না? দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল-কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসে বড় বড় ক্যাম্পাসে। এই ভিডিও দেখার পর কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ঢাবি বিমুখ হয়ে পড়লে লাভটা কার?
নাকি ‘সর্ব বাবু’ বোঝাতে চাইছেন তার প্যানেলই সর্বেসর্বা? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দখলে থাকায় শিবির প্যানেলের এই নেতা ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতেই থাকবেন বলে ধারণা করি। কিন্তু তিনি যা করেছেন তা রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ। নিজের সাফাই গেয়েছেন তিনি এভাবে, ‘শিক্ষার্থীদের তো আমার কাছে চাওয়া-পাওয়া আছে। তারা (ক্যাম্পাসের বাইরের লোকজন) যখন প্রতিনিয়ত মাঠে এসে ইটপাটকেল মারে এবং তাদের বারবার বলার পরেও যখন কথা শোনে না, সেই জায়গা থেকে আমাকেও তো কিছু করতে হয়, তাই না?’
সর্ব মিত্রের কথায় প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কি ঘৃণার চাষাবাদ চায়? আমরা জানি, ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে। একটা ‘প্রায় ক্যাম্পাস’ আবহ থাকে; যেখানে পারস্পারিক সম্প্রীতি বিরাজমান। কিন্তু এই কাণ্ড সেই সম্প্রীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিল। একজন নেতার সন্ত্রাসী আচরণের কারণে ঢাবি ছাত্ররা স্থানীয়দের কাছ থেকে সম্মান হারালেন। ‘কিছু করা’ বলতে সর্ব মিত্র যদি আইন হাতে তুলে নেওয়া বোঝান, তাহলে এর প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত তো?
ডাকসুর সদস্য হয়ে ‘সর্ব বাবু’ ভুলে গেলেন তিনি দেশের একটি সংখ্যালঘু সমাজেরও প্রতিনিধি। এই ঘটনার জনপ্রতিক্রিয়া খারাপ হলে তারই প্যানেলের একটি গুপ্ত অংশ তাকে জাতিগতভাবে আক্রমণ করবে। যা ইতোমধ্যে ফেসবুকে দৃশ্যমান। অর্থাৎ, তিনি একটি জাতিগত ঘৃণার বীজও বপন করে দিলেন এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থানীয়দের মুখোমুখি অবস্থানে দেখতে চাই না। বিশ্ববিদ্যালয় তার পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রেখে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিয়ে জনসাধারণের জন্যও কিছু জায়গা উন্মুক্ত রাখুক। এতে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়েও মানুষের জ্ঞানাহরণের ক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে। সেখানে কেউ এমন সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে চাইবেন না।
সর্ব মিত্রকে ডাকসু সদস্যের দায়-দায়িত্ব মনে করিয়ে দিতে চাই না। কিন্তু একই পরিচয়বহনকারী কাউকে যেন তার এসব কর্মকাণ্ডের দায় বহন করতে না হয়, অতটুকু মানবিক বোধ তার মধ্যে জাগ্রত হবে বলে আশা করি।
লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :