ঢাকা সোমবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫

দেওল সাম্রাজ্যের কে কোথায়? 

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৬, ২০২৫

দেওল সাম্রাজ্যের কে কোথায়? 

ধর্মেন্দ্র—হিন্দি সিনেমার সেই চিরসবুজ নায়ক চলে গেছেন। রেখে গেছেন হাজারো সুখস্মৃতি, আর ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্যের ধারক তার নিজের পরিবার। তার উপস্থিতি, তার পর্দার দাপট, তার পরিবার–পরিজনের গল্প—সবই রয়ে যাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের মহাকাব্যে চিরকালীন শিরোনাম হয়ে।

পাঞ্জাবের লুধিয়ানার ছোট্ট গ্রাম নসরালি থেকে উঠে আসা ছেলেটা হয়তো কখনো ভাবতেই পারেননি তার জীবন এমন কিংবদন্তি হয়ে উঠবে। একটি ট্যালেন্ট কনটেস্টে জয়ী হওয়ার পুরস্কার হিসেবে যে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল, সেটি হয়নি। কিন্তু, নিয়তির অন্য পরিকল্পনা ছিল। পরিচালক অর্জুন হিঙ্গোরানি তাকে খুঁজে পেলেন, আর ১৯৬০ সালে ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ দিয়ে শুরু হলো ধর্মেন্দ্রর চলচ্চিত্রযাত্রা।

এরপরের গল্পটা আমরা সবাই জানি—হিন্দি সিনেমার সর্বাধিক হিট ছবিতে অভিনয়ের রেকর্ড, রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাকশন হিরো—সব ক্ষেত্রেই সমান দাপট, আর সর্বোপরি মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়ার অদম্য ক্ষমতা। কিন্তু পর্দার বাইরের জীবনটাও ছিল সমান আলোচিত। দুটি বিয়ে, ছয় সন্তান, আর আজ তাঁর পরিবারের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে চলচ্চিত্র–জগতে যুক্ত।

১৯৫৪ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌরকে বিয়ে করেন ধর্মেন্দ্র। তাদের ঘরে জন্ম নেন দুই ছেলে—সানি ও ববি, আর দু’টি মেয়ে—বিজেতা ও অজীতা। সানি পরে বাবার মতোই পরিণত হন বলিউডের শক্তিশালী অ্যাকশন–তারকাতে। বেতাব, ঘায়েল থেকে গাদার—সবখানেই ছিল ধর্মেন্দ্রর ছায়া।

ধর্মেন্দ্রের বড় ছেলে সানি দেওল ঘর বেঁধেছেন পূজা দেওলের সঙ্গে। তাদের দুই ছেলে—করন ও রাজবীর। করন দেওল আবার বিয়ে করেছেন অর্জুন আচার্যের নাতনি দৃশা আচার্যকে। ২০১৯ সালে পল পল দিল কে পাস ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে করনের বলিউড-যাত্রা শুরু, পরে অপনে ২–এও দেখা গেছে তাকে। অন্যদিকে ছোট ছেলে রাজবীর দেওল ২০২৩ সালে দোনো ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে পা রাখে।

ববি দেওল, পুরো নাম বিজয় সিং দেওল, পরিবারে সবার আদুরে সন্তান হিসেবেই বড় হয়েছেন। ১৯৯৫ সালে টুইঙ্কল খান্নার বিপরীতে বারসাত ছবিতে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ‘চকলেট বয়’ ছিলেন ক্যারিয়ারের শুরুতে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে উত্থান–পতন দেখলেও অ্যানিম্যাল ছবিতে অভিনয়ের পর যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন তিনি। নেটফ্লিক্স–এর সাম্প্রতিক আলোচিত ‘ব্যাডস অব বলিউড’ সিরিজেও তার অভিনয় বেশ সাড়া ফেলেছে। ববি দেওলের স্ত্রী তান্যা আহুজা, তাদের দুই ছেলে—আর্যমান ও ধরম। দাদার নামধন্য ‘ধরম’কে নাম দেওয়া হয়েছে ধর্মেন্দ্রের নাম অনুসারেই।

ধর্মেন্দ্র–প্রকাশ কৌর দম্পতির দুই মেয়ে—বিজেতা ও অজিতা—রয়ে গেছেন আড়ালে, গ্ল্যামারের বাইরে, খুব শান্ত ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। বিজেতা বিয়ে করেছেন বিবেক গিলকে; তাদের দুই সন্তান—সাহিল গিল ও প্রেরণা গিল। অজিতা দেওল থাকেন বিদেশে। তিনি বিবাহিত ড. কিরণ চৌধরির সঙ্গে, তাদের দুই মেয়ে—ড. নিকিতা মীনা, যিনি ডাক্তার, এবং প্রিয়াঙ্কা চৌধরি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

হেমা মালিনীর সঙ্গে ধর্মেন্দ্রের সংসারে এসেছে দুই মেয়ে—ঈশা ও অহনা। ঈশা দেওল অভিনয় শুরু করেছিলেন ‘কোই মেরে দিল সে পুছে’ দিয়ে; পরে ধুম, যুবাসহ বেশ কিছু সফল ছবিতে অভিনয় করেন। পরে সংসারে মন দিয়েছেন। ধুম সিরিজের প্রথম কিস্তিতে তিনি মনে রাখার স্মৃতি রেখে গেছেন। তবে বিয়ের পর ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন পর্দার আলো থেকে। সাবেক স্বামী ভরত তখতানির সাথে দুই কন্যা—রাধ্যা ও মিরায়া—কে কেন্দ্র করেই এখন তার ব্যস্ততা।

অন্যদিকে অহনা দেওল বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ—নৃত্য ও পরিবারের শান্ত জীবন। ওড়িশি নৃত্যশিল্পী অহনা অভিনয়জগত এড়িয়ে চলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। স্বামী বৈভব ভোহরার সঙ্গে তার সংসারে আছে যমজ দুই কন্যা—অ্যাস্ট্রাইয়া ও অ্যাডিয়া, আর এক ছেলে—ডেরিয়ান ভোহরা।

এই বিস্তৃত পরিবারটাই ধর্মেন্দ্রের আসল উত্তরাধিকার—পরিবার, অনুরাগ, এবং একেকটা জীবনের গল্পে মিশে থাকা তার দীর্ঘ ছায়া। এই বিশাল পরিবারের শিকড় ছিল ধর্মেন্দ্রর পাঞ্জাবি মাটিতে, এক স্নেহময়, মূল্যবোধ–সমৃদ্ধ পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, কঠোর কিন্তু অনাবিল স্নেহময় মানুষ। মা ছিলেন ঘরের মমতার কেন্দ্রবিন্দু।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র ছিলেন আলোচনার কেন্দ্র, শুধু তার কাজের জন্য নয়, তার মানুষটির জন্যও। পরিবারকে আগলে রাখা, সহঅভিনেতাদের ভালোবাসা, ভক্তদের প্রতি অকৃত্রিম টান—সব মিলিয়ে তিনি বলিউডের অরিজিনাল হী–ম্যান, কিন্তু হৃদয়ে ছিলেন সহজ, প্রাণখোলা এক পাঞ্জাবি মানুষ।

আজ তিনি নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তার হাসি, তার সংলাপ, শোলে–র ‘ইমলির মতো মিঠি’ স্মৃতি, আর পর্দাজোড়া এক অমর উপস্থিতি। ধর্মেন্দ্র চলে গেছেন, কিন্তু তার গল্প—আমাদের সিনেমার ইতিহাসের এক অনবদ্য অধ্যায়—চিরকাল বলা হবে, বারবার।

Link copied!