ঢাকা রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬

কেয়া কসমেটিকসের ৮.৫ হাজার কোটি টাকা ‘উধাও’: চার সংস্থার যৌথ জালে ৪ ব্যাংক

আমার ক্যাম্পাস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬

কেয়া কসমেটিকসের ৮.৫ হাজার কোটি টাকা ‘উধাও’: চার সংস্থার যৌথ জালে ৪ ব্যাংক

রপ্তানির মাধ্যমে দেশে এসেছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকের সনদ—সব নথিতেই রয়েছে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসার তথ্য। কিন্তু অভিযোগ, গ্রাহকের ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টে সেই অর্থের কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং ওই অর্থের বিপরীতে কেয়া কসমেটিকসের ওপর চাপানো হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ফোর্সড লোন’।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের প্রায় দুই দশকের বৈদেশিক বাণিজ্য ও ব্যাংকিং লেনদেন খতিয়ে দেখতে গিয়ে এমন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক।

অভিযোগ অনুযায়ী, চার ব্যাংকের মাধ্যমে মোট প্রায় ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, উধাও হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থের অভিযোগ উঠেছে সাউথইস্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে প্রায় ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার গায়েবের অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক—প্রায় ২০ কোটি ১৯ লাখ ডলার। ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৫ লাখ ডলার এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে ৬৫ লাখ ডলার উধাও হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংককেই কেয়া কসমেটিকসের অনুকূলে ‘প্রসিড রিলাইজেশন সার্টিফিকেট’ দিয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি আয় দেশে এসেছে—এমন স্বীকৃতি ছিল। কিন্তু অভিযোগ, ব্যাংকগুলো সেই বৈদেশিক মুদ্রা গ্রাহকের হিসাবে জমা না দেখিয়ে ভিন্নভাবে হিসাব করেছে।

কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠানের অভিযোগ, সাউথইস্ট ব্যাংক নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট থেকে রপ্তানি অর্থের পেমেন্ট কেটে নেওয়ার পরও নিয়ম না মেনে গ্রাহকের হিসাব থেকে আবারও অর্থ কেটে নেয়। তার দাবি, এভাবে ‘ডাবল ডেবিটিং’-এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ফোর্সড লোন তৈরি করা হয়েছে।

পরে এসব ঋণ দীর্ঘমেয়াদি টার্ম লোনে রূপান্তরের মাধ্যমে কেয়া গ্রুপকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি বানানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি কেয়া গ্রুপের।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পুরো বিষয়টিকে ‘ভুল তথ্য’ বলে দাবি করেছে। তবে পূবালী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এদিকে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে চারটি নিয়ন্ত্রক ও তদন্তকারী সংস্থা।

দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক—মানি লন্ডারিং ও ব্যাংকিং জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে। এ জন্য সাউথইস্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেয়া কসমেটিকসের চেয়ারম্যানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সংস্থাটি।

ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল—এফআরসি—খতিয়ে দেখছে ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত তথ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড এবং কেয়া কসমেটিকসের ব্যালান্স শিটের মধ্যে থাকা গরমিল।

এদিকে বিএসইসির নির্দেশে কেয়া কসমেটিকসের আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিশেষ নিরীক্ষা চালাচ্ছে অডিট ফার্ম পিকেএফ আজিজ হালিম কবির চৌধুরী।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অভিযোগের সময়কাল ২০ বছর আগের হলেও বিষয়টি তদন্তের বাইরে থাকবে না। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনিয়ম কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা গায়েবের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথি, ব্যাংকগুলোর হিসাব এবং কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের মধ্যে থাকা অসঙ্গতি তদন্তে উঠে এলে শুধু কেয়া কসমেটিকস নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং তদারকির সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!