ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

ঢালাও সাজা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা: আইনের শাসন রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি

আমার ক্যাম্পাস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৬

ঢালাও সাজা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা: আইনের শাসন রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি

রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার পুলিশ হাউজিং-১ আবাসিকের একটি বাড়িতে ডিবি পুলিশের অভিযানে ৮৫ জনকে আটক করা হয়। কোনো ধরনের মাদক পরীক্ষা ছাড়াই ওই ৮৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনাটি দেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এক গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের ভেন্যু ছিল পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার (অতিরিক্ত ডিআইজি) ভাড়া দেওয়া বাড়ি, যেখানে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে উপস্থিত এক বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর বাবা একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, তাঁর ছেলে কেবল একটি মিউজিক্যাল ইভেন্টে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। অথচ ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে মাদক গ্রহণের অভিযোগে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন, যেখানে ন্যূনতম চিকিৎসাগত বা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়াই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা কেবল বিচারহীনতার নজিরই নয়, বরং এটি সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা কবচ রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যার দ্বারা কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। যেকোনো বিচারপ্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হলো—দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ বিবেচিত হবেন। কিন্তু কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত প্রমাণ (যেমন—ইউরিন বা ব্লাড টেস্ট) ছাড়াই ঢালাওভাবে ৮৫ জনকে সাজা দেওয়া এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) আইন, ২০০৯-এর বিধান অনুযায়ী তাৎক্ষণিক বিচার পরিচালনার সুযোগ থাকলেও, সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণে বস্তুনিষ্ঠ ও অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অপরাধ প্রমাণের জন্য সাধারণত পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা বা চিকিৎসকের সনদ বাধ্যতামূলক। চিকিৎসাগত পরীক্ষা ছাড়া মাদক গ্রহণের মতো একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ করা আইনগতভাবে প্রায় অসম্ভব।

এই ঘটনার গভীরে বেশ কিছু প্রশ্ন ও উদ্বেগজনক দিক জড়িত রয়েছে। একটি বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান, সভা বা জমায়েতে উপস্থিত থাকলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। যদি সেখানে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম বা মাদক সেবন হয়েও থাকে, তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তি তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না—তা পৃথকভাবে যাচাই না করে ঢালাওভাবে সবাইকে সাজা দেওয়া বিচারিক সুবিবেচনার অভাব নির্দেশ করে। তাছাড়া ঘটনার শিকার তরুণটি একজন পেশাদার বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। সাংস্কৃতিক বা পেশাগত প্রয়োজনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের যাতায়াত থাকে; যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের পেশাজীবীদের আটক ও সাজা প্রদান সংস্কৃতির চর্চা ও পেশাগত নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। পাশাপাশি যে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়েছে, সেটি একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার ভাড়া দেওয়া বাসা হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ রয়েছে কি না, কিংবা সাধারণ নাগরিকদের ওপর অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ করা হয়েছে কি না—তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

নাগরিকের মানবাধিকার ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। ভবিষ্যতের জন্য কোনো ধরনের পরীক্ষামূলক প্রমাণ ছাড়াই একসঙ্গে ৮৫ জনকে সাজা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। ভ্রাম্যমাণ আদালত বা যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ায় মাদক বা এ জাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত বা রাসায়নিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে, কারণ পরীক্ষা ছাড়া কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যেসব ক্ষেত্রে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া বা প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে দণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনা করে ভুক্তভোগী নিরপরাধ তরুণদের দ্রুত মুক্তি ও আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না ঘটে এবং সাধারণ নাগরিকেরা অকারণে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক।

দেশ যখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার সুসংহত করার পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছে, তখন এ ধরনের ঘটনা জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করে। রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার মূল দায়িত্ব হলো নিরপরাধ কাউকে শাস্তি না দিয়ে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। তাই এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সময়ের জোরালো দাবি।

আমার ক্যাম্পাস

Advertisement
Advertisement
Advertisement
Link copied!