নব্বইয়ের দশকের সন্ধ্যাগুলো বাংলাদেশের জন্য অন্যরকম ছিল। স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ করার পর বিশ্বখ্যাত সব টিভি সিরিজ দেখার একটাই পর্দা ছিল তখন, বাংলাদেশ টেলিভিশন-বিটিভি। ম্যাকগাইভার, রবিন হুড, মিস্টেরিয়াস আইল্যান্ড, রোবোকপ, হারকিউলিসের মতো বিশ্বকাঁপানো সিরিজগুলো তখন নিয়মিত দেখানো হতো বিটিভিতে।
এসবের মধ্যে কিছুটা আলাদা ছিল ম্যাকগাইভার। আজকের দিনে যেমন গেম অব থ্রোনস মানেই ছিল “আজকের পর্ব মিস করা যাবে না”, নব্বইয়ের দশকে ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত ছিল ম্যাকগাইভার। পার্থক্য একটাই, সেখানে ড্রাগন ছিল না, ছিল পেপার ক্লিপ, চুইংগাম আর সুইস আর্মি নাইফ।
সেই সময়ের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল ম্যাকগাইভার শুরু হওয়ার আগের কয়েক সেকেন্ড। পরিচিত সেই থিম মিউজিক বাজতে শুরু করলেই বোঝা যেত, গল্প শুরু হচ্ছে। শোনা যায়, এই থিম সং তৈরিতে ভূমিকা ছিল ম্যাকগাইভার চরিত্রে অভিনয় করা রিচার্ড ডিন অ্যান্ডারসনেরও।
সিরিজটির মূল চরিত্র অ্যাঙ্গাস ম্যাকগাইভার, যিনি বন্দুক নয়, ব্যবহার করতেন বুদ্ধি। অভিনয়, শরীরী ভাষা আর কণ্ঠস্বর মিলেই ম্যাকগাইভার হয়ে উঠেছিলেন এক প্রজন্মের আইকন।
‘দুর্বল’ নায়ক
১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি টেলিভিশনে শুরু হয় ম্যাকগাইভার সিরিজ। মূল চরিত্রে ছিলেন রিচার্ড ডিন অ্যান্ডারসন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত চলা এই সিরিজ মোট ৭ সিজনে ১৩৯টি পর্ব প্রচারিত হয়।
বাংলাদেশে ম্যাকগাইভারের জনপ্রিয়তা তৈরি হয় নব্বই দশকে। বিটিভিতে দেখানো হতো এই সিরিজ। পরে নতুন শতকের শুরুতেও একুশে টেলিভিশনেও বাংলায় ডাবিং করে এই সিরিজ দেখানো হয়েছে। দুইবারই দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল সিরিজটি।
সে সময় নাইট রাইডার, দি এ-টিম, হারকিউলিস, রবিন হুডের মতো বেশ কয়েকটি টিভি সিরিজ তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। এর মধ্যে ম্যাকগাইভার আলাদা হয়ে উঠেছিলেন তার একেবারেই ভিন্ন নায়কোচিত গুণে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নায়করা থাকেন শক্তিশালী। মারামারিতে কুপোকাত করেন ভিলেনদের । তবে ম্যাকগাইভার ছিলেন আলাদা। তিনি মার খেতেনই বরং বেশি। কারণ তার শক্তিমত্তা শরীরে নয়, ছিল বুদ্ধিতে।
একটা বোমা? একটা আটকে পড়া দরজা? একটা পাহাড়ের কিনারে বিপদ? এখান থেকে ম্যাকগাইভার ঠিকই বের হয়ে যেতেন আর সমাধান আসত আশপাশে পড়ে থাকা জিনিস দিয়েই, কখনো সেটা পেপার ক্লিপ, টেপ, ব্যাটারি, চুইংগাম কিংবা একটা সাধারণ দেশলাই।
এই সিরিজের পরই ইংরেজি ভাষায় একটা শব্দ জনপ্রিয় হয়—“Mcgyverism”। অর্থাৎ, অপ্রচলিত উপায়ে সমস্যা সমাধান করা। ২০০৯ সালে এই শব্দটি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতেও যুক্ত হয়।
পড়াশোনা ছেড়ে ম্যাকগাইভার
১৯৫০ সালের ২৩ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া রিচার্ড ডিন অ্যান্ডারসনের স্বপ্ন ছিল হকি খেলোয়াড় হবেন। তবে একবার হাত ভেঙে গেলে সেই আশা অপূর্ণ থেকে যায়।
এরপর স্কুলে পড়ার সময় জ্যাজ মিউজিশিয়ান হওয়ার স্বপ্নে অনেক দিন গানের পেছনে ছুটেছেন। গান গাইতে গাইতে আবিষ্কার করেন, তার আসল আগ্রহ অভিনয়ে। গান-বাজনাকে বিদায় জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট ক্লাউড স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনয়ে পড়াশোনা শুরু করেন রিচার্ড। এরপর ভর্তি হন ওহাইও ইউনিভার্সিটিতে।
এ সময় হঠাৎই সাইকেলে করে আলাস্কা ঘুরতে চলে যান রিচার্ড। সাইকেল চালানোর লোভেই নাকি শেষ বর্ষে এসে বিশ্ববিদ্যালয়কেও বিদায় জানিয়ে দেন ম্যাকগাইভার তারকা।
এরপর সামুদ্রিক প্রাণীদের সার্কাস, থিয়েটার থেকে শুরু করে রাস্তায় জাদু দেখানোর কাজও করেছেন তিনি। অনেকটা সময় এখানে-সেখানে ঘুরে শেষ পর্যন্ত ২৬ বছর বয়সে অভিনয়ে থিতু হন।
৩৫ বছর বয়সে ম্যাকগাইভার সিরিজে অ্যাঙ্গাস ম্যাকগাইভার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান, যা তার জীবন পালটে দেয়। বিশ্বজুড়ে হয়ে ওঠেন তুমুল জনপ্রিয়। এরপরও একাধিক টিভি সিরিজে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে তার ম্যাকগাইভার চরিত্রটিই এখনো অমলিন।
নব্বইয়ের দশকের গেম অব থ্রোনস
আজকের দিনে যেমন গেম অব থ্রোনস মানেই আলোচনা, তর্ক, ভবিষ্যদ্বাণী। নব্বইয়ের দশকে সেই জায়গাটা দখল করে ছিল ম্যাকগাইভার। তবে পার্থক্যটা ছিল স্পষ্ট। সেখানে ড্রাগন ছিল না, ছিল পেপার ক্লিপ, চুইংগাম আর সুইস আর্মি নাইফ। জাদু ছিল না, ছিল বিজ্ঞান।
পরেরদিন স্কুলে বিষয়টিা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা তো যে “কালকের পর্বটা দেখছিস?” কেউ কেউ বাসায় ম্যাকগাইভার হওয়ার চেষ্টা করতো। পেপার ক্লিপ দিয়ে তালা খুলতে, ব্যাটারি খুলে কিছু বানাতে চেষ্টা করতো। অনেকে বকাও খেয়েছে, কিন্তু ম্যাকগাইভার হওয়া থামায়নি।
শৈশবে গলায় গামছা পেচিয়ে সুপারম্যান হতে চাওয়া শিশুরা ম্যাকগাইভারও হতে চেয়েছে অনেকবার।
আজও কেন প্রাসঙ্গিক ম্যাকগাইভার
আজকের সুপারহিরোরা আসে সিজিআই, বিলিয়ন ডলারের বাজেট আর অতিমানবীয় ক্ষমতা নিয়ে। সেখানেই ম্যাকগাইভার অনন্য। শুধু ক্রিটিকাল থিংকিং দিয়ে তিনি মানুষের মন জয় করেছিলেন। নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অতিমানব পর্যায়ে।
আজকের শিশুদের যে স্টেম (STEM ) শিক্ষা দেওয়া হয়, বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে চলে পাঠদান। ম্যাকগাইভার সেগুলো শিখিয়েছিলেন বিনোদনের ভেতর দিয়ে, কোনো ক্লাসরুম ছাড়াই।
নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে যারা বড় হয়েছে, তাদের জন্য ম্যাকগাইভার কোনো সিরিজ নয়, এটা এক ধরনের নস্টালজিয়া।

আপনার মতামত লিখুন :