ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিদেশে মাস্টার্স: প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে

রাফিনূর রহমান, কানাডা থেকে 

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬

বিদেশে মাস্টার্স: প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশে বিদেশে পাড়ি জমান। উচ্চশিক্ষার জন্য জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন এবং জার্মানি। এসব দেশে উন্নতমানের শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিগ্রি অর্জনের সুবিধা থাকায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি।

বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হলো দেশ নির্বাচন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, কোর্স কাঠামো, টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবহাওয়া, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলোতে বহু সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বৈচিত্র্যময় একাডেমিক কাঠামো শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ তুলনামূলক সীমিত হলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী বা শিক্ষকতা সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের মাধ্যমে আংশিক বা পূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ থাকে। আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের উচিত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা পরিচালনাকারী অধ্যাপকদের সঙ্গে আগেভাগে যোগাযোগ করা। ইউরোপের কিছু দেশে টিউশন ফি তুলনামূলক কম বা নেই বললেই চলে। বিশেষ করে জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়ার কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম খরচে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে, যা আর্থিকভাবে সীমিত শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী। পড়াশোনা শেষে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা থাকলে কানাডা একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য, কারণ সেখানে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ রয়েছে।

বৃত্তির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন Erasmus Mundus, Commonwealth Scholarship Commission এবং DAAD আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রদান করে থাকে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে টিউশন ফি, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

আবেদনের সময়সূচি দেশভেদে ভিন্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ফল ও উইন্টার সেশনে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। ফল সেশনের আবেদন সাধারণত আগের বছরের আগস্ট থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি পর্যন্ত চলে, কখনও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ে। উইন্টার সেশনের আবেদন সাধারণত এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়, তবে সব কোর্স এই সেশনে চালু থাকে না। ইউরোপীয় দেশগুলোর সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে, তাই নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

মাস্টার্সের বিষয় নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী চাহিদাসম্পন্ন বিষয়, নিজ দেশের চাকরি বাজারে সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পেশাগত লক্ষ্য, গবেষণার সুযোগ এবং ডিগ্রির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা উচিত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যকেন্দ্র বা পূর্ববর্তী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরামর্শ করলে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া সহজ হয়। পরিকল্পিতভাবে অন্তত ১০ থেকে ১২ মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করলে আবেদন প্রক্রিয়া, ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা, কাগজপত্র প্রস্তুত ও আর্থিক পরিকল্পনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। বিদেশে মাস্টার্স করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ভাষাগত যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ইংরেজিভাষী দেশে ভর্তির জন্য আইইএলটিএস বা টোফেল পরীক্ষার স্কোর প্রয়োজন হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট বিভাগভেদে জিআরই বা জিম্যাট স্কোরও চায়। তাই আবেদন শুরুর কমপক্ষে এক বছর আগে ভাষা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পরীক্ষার ফল প্রকাশ, স্কোর পাঠানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ন্যূনতম স্কোর যাচাই– এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

আবেদন প্রক্রিয়ায় স্টেটমেন্ট অব পারপাস, রিকমেন্ডেশন লেটার এবং সিভি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্টেটমেন্ট অব পারপাসে শিক্ষার্থীকে নিজের একাডেমিক পটভূমি, গবেষণা আগ্রহ, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয় কেন উপযুক্ত– এসব বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হয়। একই সঙ্গে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত রাখা জরুরি।

ভিসা প্রক্রিয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রত্যেক দেশের শিক্ষার্থী ভিসার নিয়ম আলাদা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ দেখাতে হয়। অনেক দেশে পড়াশোনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় কাজ করার অনুমতি থাকে, যা শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক। সব মিলিয়ে সঠিক পরিকল্পনা, সময়মতো প্রস্তুতি এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথকে সহজ ও সফল করতে পারে।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!