ফ্রান্সের চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, ইউরোপীয় ক্রেতাদের পোশাক কেনায় ধারাবাহিক সতর্কতা এবং পণ্যের পাইকারি দাম কমানোর বাড়তি চাপ—এই তিনের সম্মিলিত ধাক্কায় নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। ইইউর কিছু দেশে সাময়িক রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিক চাহিদা, বাজার অংশীদারিত্ব এবং ইউনিট প্রতি বিক্রয়মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা রপ্তানি আয় ও কারখানার মুনাফায় চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব গিয়ে পড়ছে কারখানার সার্বিক উৎপাদন কার্যক্রম, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম আয়ের সুযোগের ওপর। গাজীপুরের কারখানার সুইং অপারেটরদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানা যায়, আগে যেখানে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ওভারটাইম কাজের সুযোগ ছিল, এখন শিপমেন্ট ও অর্ডারের অভাবে অনেক দিন বিকেল ৫টার মধ্যেই কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির এই সময়ে শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন করে তুলেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ইইউর বাজারে সামগ্রিক পোশাক রপ্তানি ৩.৩৩ শতাংশ বাড়লেও ফ্রান্সের বাজারে রপ্তানি ৪.৯১ শতাংশ কমে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় ১১.৬৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১,১৯৩ কোটি ইউরোতে এবং সামগ্রিক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব ২১.৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কেজিপ্রতি ১৪.৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩.৭৬ ইউরোতে গিয়ে ঠেকেছে। অতিরিক্ত মজুদ, ইইউজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খুচরা বিক্রিতে মন্দার কারণে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার কমানোর পাশাপাশি সরবরাহকারীদের ওপর অতিরিক্ত মূল্যছাড়ের চাপ দিচ্ছেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, ফ্রান্সের অস্থিতিশীলতা বিশ্বাবাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করলেও পুরো ইউরোপীয় অর্থনীতির মন্দা ও ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচনই মূলত এই সংকটের মূল কারণ। জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ বাড়ার এই সময়ে পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও ঋণাত্মক মুনাফার আশঙ্কা বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানিকারকদের স্বল্পমেয়াদে ইইউ ক্রেতাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে কেবল ইউরোপের গুটি কতক ঐতিহ্যবাহী বাজারের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতা ও সংকট মোকাবিলার তাগিদ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।



আপনার মতামত লিখুন :