একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের চার ইউনিয়ন) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার পরিবর্তে এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে আসা রাশেদ খান। এতে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। বহিরাগত কোনো প্রার্থী তারা মেনে নেবেন না এবং যাকে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে পাশে পাননি, তাকে ভোট দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ৯ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে যাচাই-বাছাইয়ে বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আবু তালিব, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল জলিল, জাতীয় পার্টির এমদাদুল ইসলাম বাচ্চু ও গণফোরামের খনিয়া খানমের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
রাশেদ খানের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকায় ভোটের হিসাবনিকাশ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এটিই এখন স্থানীয় নেতাকর্মীসহ শহর ও গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে আলোচনার প্রধান খোরাক।
বিএনপির সাধারণ কর্মী ও সমর্থকরা জানান, এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে ছিলেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, হামিদুল ইসলাম হামিদ ও মুর্শিদা জামান পপি। কিন্তু শেষমুহূর্তে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খানকে ধানের শীষের মনোনয়ন দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যারা নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন, হামলা-মামলা সামলেছেন তাদের মূল্যায়ন না করে কালীগঞ্জে যার কোনো স্থায়ী বাড়িও নেই, এমন একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ও মুর্শিদা জামান পপি মনোনয়নপত্র জমা দেন। মুর্শিদা জামান পপি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারও করলেও মাঠে রয়ে গেছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।
নেতাকর্মীরা বলেন, কালীগঞ্জের স্বার্থ উপেক্ষা করে বহিরাগত চাপিয়ে দিলে মানুষ তা মেনে নেবে না। রাশেদ খান কখনো কালীগঞ্জের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না, এমনকি অনেকেই তাকে চেনেন না। দীর্ঘদিন তিনি ঝিনাইদহ-২ আসনে গণসংযোগ করলেও কালীগঞ্জের নেতাকর্মীদের পাশে থাকার কোনো ভূমিকা ছিল না। স্থানীয়রা মনে করেন, ফিরোজ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে কালীগঞ্জের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলসহ বিভিন্ন অন্যায় দূর হয়ে যাবে।
জানা গেছে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ২৪ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খানের নাম ঘোষণা করেন। প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ মিছিল এবং শুক্রবার কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন নেতাকর্মীরা। সমাবেশে বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তন না হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে সাইফুল ইসলাম ফিরোজকে বহু মামলা ও হামলার শিকার হতে হয়েছে। অন্য নেতাকর্মীরাও মামলা-হামলার শিকার হয়ে বাড়িছাড়া ছিলেন। সাইফুল ইসলাম ফিরোজ তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, মামলা চালানোর সব খরচ বহন করেছেন। এ কারণে বিএনপির তৃণমূলের সব নেতাকর্মী ফিরোজেই আস্থা রেখে একাট্টা রয়েছেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কালীগঞ্জ পৌর শাখার আহ্বায়ক জুয়েল রানা বলেন, ‘সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান কালীগঞ্জের ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মীকে চেনেন না। এখনও পর্যন্ত কারও সঙ্গে কোনোদিন সাক্ষাৎও করেননি। তিনি কীভাবে ভোট করবেন? আমরা আমাদের নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ছাড়া কাউকে চিনি না। তিনিই বিএনপির একমাত্র প্রার্থী।’
একই রকম বক্তব্য দিয়ে উপজেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম বলেন, কালীগঞ্জ উপজেলার মানুষ সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ছাড়া আর কাউকে চেনেন না। তাই এবারের নির্বাচনে তার কোনো বিকল্প নেই। জনগণ তাকেই এমপি হিসেবে দেখতে চায়।
উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব সুজাউদ্দিন পিয়াল বলেন, রাশেদ খান কালীগঞ্জের বাসিন্দা নন। ভোট শেষে তিনি চলে যাবেন-এমন আশঙ্কা রয়েছে। যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বহিরাগতকে মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূলে ক্ষোভ চরমে।
কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম সাইদুল বলেন, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ যেভাবে কালীগঞ্জ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন তা বিরল। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাজপথে থেকে লড়ে গেছেন। ফিরোজ কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপস করেননি। তিনি বলেন, সাইফুল ইসলাম ফিরোজের একটাই লক্ষ্য, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়ন করা। এ ছাড়া কালীগঞ্জ থেকে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করা।
এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি এখানে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। এলাকার সিংহভাগ বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তার সঙ্গে আছেন। সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান বাইরের মানুষ। তিনি এ আসনের ভোটার নন। এ আসনের অনেকেই তাকে চেনেন না। দলীয় নেতাকর্মীর সঙ্গেও তেমন পরিচিতি নেই। যে কারণে নির্বাচনে আশানুরূপ ফল পাওয়া অসম্ভব।
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটার নির্বাচনে তাকেই চাইছেন উল্লেখ করে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমি ভোটের মাঠে থাকতে চাই। দলীয় প্রতীক বিবেচনার জন্য তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি বিনীত আহ্বানও জানান।

আপনার মতামত লিখুন :