ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

আমার ক্যাম্পাস প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬

পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

​বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনার মধ্যেই বাংলাদেশের মাটিতে এসেছেন নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। 

গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং প্রবীণ বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদী কোনো পেশাদার কূটনৈতিক নন। তবে তিনি একজন ঝানু রাজনীতিবিদ একথা অনস্বীকার্য। গত এপ্রিলে ভারত সরকার তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। 

দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘ ৫৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার করে বাংলাদেশে পাঠাল নয়াদিল্লি।
​বাংলাদেশে প্রবেশ করেই দিনেশ ত্রিবেদী তার স্বভাবসুলভ আন্তরিকতায় দুই দেশের মেলবন্ধনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “আমাদের যে ১৪০ কোটি জনসংখ্যা রয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি যোগ করলে মোট ১৬০ কোটি হয়। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে, আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না, আমি হেঁটে চলে আসছি! আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমস্যার সমাধান করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, আমাদের অভিন্ন স্বপ্নও আছে। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।” হাইকমিশনার হিসেবে নিজের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করে তিনি আরও বলেন, “আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাইবোন ও মা—তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
​দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে পাঠানো ভারতের একটি সুস্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বার্তা। এর অর্থ হলো, তারা ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আন্তরিক। তাই বাংলাদেশকেও এখন নিজস্ব কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। সীমান্তে ক্রমাগত উত্তেজনা, হত্যাকাণ্ড কিংবা পুশইনের মতো অমানবিক ঘটনাগুলো কখনো সুসম্পর্কের সুবাতাস বয়ে আনে না, বরং তা বৈরিতারই বহিঃপ্রকাশ। এই বৈরিতা কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। বর্তমান বিশ্বে বলপ্রয়োগ বা যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব। তাই ভারতের অযৌক্তিক পুশইন তৎপরতা বন্ধে অনতিবিলম্বে আলোচনার দুয়ার উন্মুক্ত করতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক কারও জন্যই ইতিবাচক ফল আনে না।
​মনে রাখতে হবে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্ত। ভারতের পাঁচটি রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে এই বিশাল সীমান্ত সংযুক্ত। তাই সীমান্তে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দুই দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। কেবল সীমান্ত সংকটই নয়; পদ্মা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, তীব্র ভিসা জটিলতা নিরসন এবং দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ভারতের বন্দরগুলো বাংলাদেশের ব্যবহারের সুযোগ না পাওয়ার মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করা দরকার।

একটি দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক, মর্যাদাপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অপরিহার্য। বিশ্বের সবকিছু বদলানো গেলেও ভৌগোলিক প্রতিবেশী বদলানো যায় না।
​তা ছাড়া, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা এই বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক শক্তি। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যা থাকবেই, তবে তা সমাধানের একমাত্র পথ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা; পুশইন বা সীমান্তে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি করে কোনো সমাধান আসবে না। ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূতের আগমনে আলোচনার যে নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, দুই দেশেরই উচিত তা কাজে লাগানো।
​বাস্তবতা হলো, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ওই সময়ে উগ্র ভারত-বিরোধিতার আবেগকে উস্কে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে পুরোপুরি ভুল পথে পরিচালিত করে। ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টাদের দায়িত্বহীন ও উসকানিমূলক ভারত-বিদ্বেষী কথাবার্তা দেশের ভাবমূর্তি ও স্বার্থের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল 'সেভেন সিস্টার্স' নিয়ে ড. ইউনূসের বিতর্কিত মন্তব্য স্পষ্টতই একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল ছিল। অন্যদিকে, তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক কর্মরত আছেন বলে যে ভিত্তিহীন ও অসত্য তথ্য ছড়িয়েছিলেন, তা দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ইউনূস সরকার মুখে ও বাইরে তীব্র ভারত-বিরোধিতার আওয়াজ তুললেও, কার্যত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে ভারতীয় পণ্যের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছিল। তার আমলেই ভারত থেকে পণ্য আমদানি রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা বন্ধ হয়ে যায় এবং বাংলাদেশি পণ্য ভারতের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আজকের এই পুশইন সংকট মূলত ইউনূস সরকারের অদূরদর্শী ও ব্যর্থ কূটনৈতিক তৎপরতারই ফসল।
​শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, ড. ইউনূসের ভুল ও খামখেয়ালি নীতির কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়েছিল। আমাদের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। গত ৯ বছর ধরে ১২ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশের ওপর এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে ড. ইউনূসকে একজন ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে জাহির করা হলেও, বাস্তবে বৈশ্বিক কূটনীতিতে তার এমন কোনো ‘গোল’ বা সাফল্য নেই যা উদযাপন করা যায়। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গেই তার সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো কূটনৈতিক সাফল্য দৃশ্যমান হয়নি। ইউনূস আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, রোহিঙ্গারা গত বছরের রোজার ঈদ নিজ দেশ মিয়ানমারে করবেন; কিন্তু তা বাস্তবায়ন হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তার আমলেই আরও প্রায় দুই লাখ নতুন রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।
​ক্ষমতায় আসার পর ড. ইউনূস বড় গলায় বলেছিলেন, “বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে।” অথচ কার্যত দেখা গেছে, তার দেড় বছরের শাসনামলে বহির্বিশ্বের দরজা বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইউরোপের যেসব দেশের বাংলাদেশে কোনো ভিসা সেন্টার নেই, তারা ঢাকায় কার্যক্রম শুরু করবে। এজন্য তিনি দিল্লির ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের ঢাকায় দাওয়াত দিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেড় বছরে তিনি একটি দেশের ভিসা সেন্টারও দিল্লি থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করতে পারেননি, যার খেসারত দিতে হচ্ছে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে। আগে যেসব দেশে বাংলাদেশিরা অন-অ্যারাইভাল বা ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারত, তাদের অনেকেই এখন সেই সুবিধা বাতিল করেছে; বাকি দেশগুলোও ভিসা দেওয়ার হার কমিয়ে দিয়েছে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ভিসা এখন সাধারণ মানুষের জন্য সোনার হরিণ। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঢাকঢোল পেটানো হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি, যার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বহু দেশে জনশক্তি রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের ওপর নানামুখী ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে বাংলাদেশের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান কমে ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিনের পর্যায়ে নেমে গেছে। দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসেই ১১ বার বিদেশ সফর করেও ড. ইউনূসের তথাকথিত ‘ম্যাজিক’ পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।
​এই পথহারা ও বিপর্যস্ত কূটনীতিকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনাই এখন নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের ভেঙে পড়া পররাষ্ট্রনীতিকে স্বাভাবিক ও গতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের জন্য কিছু ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক খবরও আসতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি এক বছরের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ বিশ্বমঞ্চের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, যা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি বিশাল মাইলফলক।
​পাশাপাশি বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন করে চালুর জোরদার প্রক্রিয়া চলছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া। আশা করা যাচ্ছে, আগামী ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়েই বন্ধ শ্রমবাজারের দুয়ার আবার উন্মুক্ত হবে। এটি মূলত তারেক রহমানের দূরদর্শী ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’র একটি বড় ধরনের সাফল্য।
​বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিই হলো—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই শাশ্বত নীতিকে আমাদের কূটনীতিতে আবারও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, বর্তমান সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি খুব দ্রুতই তার সঠিক পথ খুঁজে পাবে এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা পুনর্প্রতিষ্ঠিত হবে।

আমার ক্যাম্পাস

Link copied!