অন্তর্বর্তী সরকার আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ–২০২৫’ জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তৈরি খসড়া আদেশ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে আদেশে কী কী থাকবে, তা সরকার নিজেই নির্ধারণ করবে বলে জানা গেছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, আগামী বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই খসড়া আদেশ উত্থাপন করা হতে পারে। গণভোটের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসে সাত দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সেই সময়সীমা আজ রোববার শেষ হচ্ছে। উপদেষ্টা ফাওজুল কবির জানিয়েছেন, সময় নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা না হলেও দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি আরও বলেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আদেশ জারি করার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন।
সূত্রগুলো জানায়, আগামী ১৩ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। এর আগে বিশেষ কোনো বৈঠকের সম্ভাবনা নেই। গত ৩০ অক্টোবরের বৈঠকে অধিকাংশ উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজনের পক্ষে মত দেন। তবে সাম্প্রতিক বৈঠকে কিছু উপদেষ্টা মত দিয়েছেন যে, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করলে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সেখানে আদেশ জারি ও সময় নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারকে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ না করতে পারলে সরকারের তৈরি সংবিধান সংশোধন বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হবে। দ্বিতীয় খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে, গণভোট আদেশ এবং তপশিলে যুক্ত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপি চায়, গণভোট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হোক এবং প্রতিটি প্রস্তাবে দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) যুক্ত থাকুক। দলের অবস্থান অনুযায়ী, যে দল গণভোটে জয়ী হবে, তারা তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া গণভোটের পক্ষে। এই দুই দলের সঙ্গে আরও আটটি দল নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।
গত এক সপ্তাহে কোনো আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তাদের দল কেবল প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানেই আলোচনায় যাবে। অপরদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, দলগুলো আলোচনা না করলেও সরকার কাউকে আলাদাভাবে ডাকবে না। উপদেষ্টাদের ধারণা, নির্বাচনী অনিশ্চয়তা এড়াতে বিএনপিও শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে।
গণভোট এবং আদেশ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করে। তবে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর মামলায় গণভোট সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলে তা সংসদে পাস করে অন্তর্ভুক্ত করার পরেই গণভোট করা যেতে পারে। বিপরীতে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, অতীতে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ও ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া গণভোট করেছিলেন, তাই নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট হওয়া উচিত।
জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও আরও আটটি দল মঙ্গলবার ঢাকায় জনসভা করে গণভোটের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার পরিকল্পনা করছে। তারা বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষমতাবলে আদেশ জারি করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে, কোনো রাষ্ট্রপতিকে নয়।
অন্যদিকে সরকারের আইন উপদেষ্টারা বলছেন, আদেশ জারি হবে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই। ইতিহাসে দেখা গেছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১০টি আদেশ জারি করেছিলেন, যার মধ্যে কিছু সামরিক আইনের অধীনে কার্যকর ছিল।
সূত্রগুলো জানায়, এবারও গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের ক্ষমতাবলে আদেশ জারি করা হবে, তবে তা রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে কার্যকর হবে।
গত ১৭ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির ১৫টি ভিন্নমত রয়েছে। জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগ, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিজেদের স্বার্থে পুনর্গঠন করতে চায়। তাই তারা বলছে, গণভোটে কোনো ভিন্নমত রাখা যাবে না এবং উচ্চকক্ষ অবশ্যই পিআর পদ্ধতিতে গঠন করতে হবে।
সূত্রঃ সমকাল

আপনার মতামত লিখুন :